Harwan fish hatchery Srinagar: ভূস্বর্গ কাশ্মীর (Kashmir) তার বরফাবৃত পর্বতমালা, ডাল লেকের শিকারা এবং আপেলের বাগানের জন্য বিশ্বখ্যাত। কিন্তু মৎস্যপ্রেমী এবং ভোজনরসিকদের কাছে কাশ্মীরের অন্য এক মস্ত বড় আকর্ষণ হলো এখানকার নদী ও পাহাড়ি ঝরনার সুস্বাদু ‘ট্রাউট’ (Trout) মাছ। আজ কাশ্মীরকে ভারতের ‘ট্রাউট ক্যাপিটাল’ বা ট্রাউট মাছের রাজধানী বলা হয়। তবে জানলে অবাক হবেন, কাশ্মীরের জলে এই ট্রাউট মাছ কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়নি।
আজ থেকে প্রায় সোয়া এক শতাব্দী আগে পর্যন্ত কাশ্মীরের মানুষ সুস্বাদু মাছের জন্য তীব্র সমস্যায় ভুগতেন। ১৯০০ সালের শুরুতে একজন ব্রিটিশ ডিউকের হাত ধরে ১০,০০০ ট্রাউট মাছের ডিম (Ova) জাহাজে করে ভারতে আসার পরেই কাশ্মীরের মৎস্য চাষের ইতিহাস চিরতরে বদলে যায়। কীভাবে সুদূর ব্রিটেন থেকে ট্রাউট মাছ এসে কাশ্মীরে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করল, সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস জেনে নিন।
১৯ শতকের শেষের দিকে এবং ২০ শতকের শুরুতে কাশ্মীরে বসবাসকারী ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় মৎস্যপ্রেমীরা এক বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কাশ্মীরের পাহাড়ি নদী ও তীব্র ঠান্ডা জলের স্রোত অত্যন্ত মনোরম হলেও, স্থানীয় প্রজাতিগুলোর মধ্যে স্পোর্ট ফিশিং (মাছ ধরার খেলা) বা খাওয়ার উপযোগী সুস্বাদু ঠান্ডা জলের মাছের অভাব ছিল। এই অভাব পূরণ করতে এবং কাশ্মীরে অ্যাংলিং বা ছিপ ফেলে মাছ ধরার খেলা জনপ্রিয় করতে উদ্যোগী হন তৎকালীন ব্রিটিশ অভিজাতরা।
প্রথম ব্যর্থ প্রচেষ্টা এবং ব্রিটিশ ডিউকের এন্ট্রি
কাশ্মীরের শীতল জলে ট্রাউট মাছ চাষের প্রথম পরিকল্পনা করা হয় ১৮৯৯ সালে। কিন্তু সে সময় প্রযুক্তি এবং পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্রিটেন থেকে আনা মাছের ডিমের প্রথম চালানটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
এই ব্যর্থতার পর হাল ধরেন ব্রিটেনের বিখ্যাত আলস্টার-এর ডিউক (Duke of Ulster)। ১৯০০ সালে তিনি কাশ্মীরের তৎকালীন মহারাজা প্রতাপ সিং-এর জন্য উপহার হিসেবে ১০,০০০ ব্রাউন ট্রাউট (Brown Trout) মাছের ডিমের (Ova) একটি বিশেষ চালান পাঠান। এই ডিমগুলো সুদূর স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ‘হাউটাউন হ্যালেরি’ (Howietoun Hatchery) থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

বেলগাছিয়া থেকে হরিওয়ান: ডিমের সেই কঠিন মহাযাত্রা
সেই যুগে এত সংবেদনশীল মাছের ডিম হাজার হাজার মাইল পথ বাঁচিয়ে রাখা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ডিমের এই চালানটি প্রথমে একটি বিশেষ জাহাজে করে সমুদ্রপথে কলকাতায় আনা হয়। কলকাতা থেকে ট্রেনযোগে তা পৌঁছায় কলকাতার বেলগাছিয়া ভেটেরিনারি কলেজে। সেখানে ডিমগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বরফাবৃত বাক্সে করে সেগুলোকে কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে রওনা করানো হয়।
অবশেষে ১৯০১ সালের প্রথম দিকে ১০,০০০ ডিমের মধ্যে প্রায় ১,৮০০টি জীবিত ডিম সফলভাবে কাশ্মীরের শ্রীনগরের অদূরে অবস্থিত ‘হরিওয়ান’ (Harwan) নামক একটি কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে (Hatchery) নিয়ে আসা সম্ভব হয়। হরিওয়ানের শীতল পাহাড়ি ঝরনার জল ট্রাউট মাছের প্রজননের জন্য ছিল একদম আদর্শ।
সাফল্যের ইতিহাস এবং ‘ট্রাউট ক্যাপিটাল’ হয়ে ওঠা
হরিওয়ানের হ্যাচারিতে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ডিম ফুটে প্রথম ট্রাউটের পোনা বের হয়। এরপর ডাল লেকের সংযোগকারী ঝরনা এবং কাশ্মীরের বিখ্যাত লিন্ডার ও ব্রিঙ্গি নদীতে এই মাছগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। কাশ্মীরের তীব্র ঠান্ডা ও পরিষ্কার জল পেয়ে ব্রাউন ট্রাউট এবং পরবর্তীতে আনা রেনবো ট্রাউট (Rainbow Trout) প্রজাতি দুটি অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে।
কয়েক দশকের মধ্যেই কাশ্মীরের নদীগুলো ট্রাউট মাছে ভরে যায়, যা বিশ্বজুড়ে অ্যাংলার ও পর্যটকদের আকর্ষণ করতে শুরু করে। বর্তমান ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে কাশ্মীর কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের ট্রাউটের চাহিদাই মেটায় না, বরং এটি কাশ্মীরের গ্রামীণ অর্থনীতি ও মৎস্য চাষীদের উপার্জনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।