গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। হামাসের অভিযোগ, মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধ বন্ধের মূল পরিকল্পনা থেকে সরে গিয়ে এখন নিরস্ত্রীকরণকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যেই নতুন করে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারীরা। এমন উত্তেজনার মধ্যেই ফ্রান্সের অস্ত্র প্রদর্শনীতে ইসরাইলের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ ইউরোপ-ইসরাইল সম্পর্কের চিড় ধরার বিষয়টিই যেন সামনে এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গাজায় চলমান বর্বরতার মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী নিকোলাই ম্লাদেনভকে সরাসরি দায়ী করেছে হামাস। সংগঠনটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম অভিযোগ করেছেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন ফোরামে বাস্তবতাবিরোধী তথ্য দিয়ে গাজা ও হামাসের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন ম্লাদেনভ।
হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ইসরাইলকে বাধ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
এদিকে, মিশরে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে নতুন দফায় আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারীরা। তবে হামাস এই প্রস্তাব সাফ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, আগে যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে; হামাস অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালেও গাজাজুড়ে ইসরাইলি বিমান হামলা থামেনি। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা পরিকল্পনার বিকল্প নিয়েও ভাবছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
চলমান আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হামাসের নেতৃত্ব নির্বাচন। সংগঠনটি জানিয়েছে, নতুন নেতৃত্ব চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কোনো শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। শীর্ষ পদের দৌড়ে এগিয়ে থাকা খলিল আল-হাইয়া ও খালেদ মাশআল দু’জনই কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত। তবে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব কোনো টেকনোক্র্যাটিক কমিটির হাতে ছাড়ার প্রশ্নে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা রয়েছে। এর মাঝেই গত সপ্তাহে হামাসের নতুন সামরিক প্রধান মোহাম্মদ ওদেহকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল।
অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। নাবলুস ও রামাল্লায় কৃষিজমিতে আগুন ধরানো, জলপাই বাগান ধ্বংস ও গবাদিপশু দিয়ে ক্ষতি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তুরমুস আয়্যায় ধ্বংস করা জমিতে নতুন কাঠামো বসানো হয়েছে। কফর আকাবে ইসরাইলি বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করেছে, আর জাবায় একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাঙার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব এখন আরও স্পষ্ট। ফ্রান্স জানিয়েছে, প্যারিসে অনুষ্ঠেয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র প্রদর্শনী ইউরোস্যাটরিতে ইসরাইলি কোম্পানিগুলো এবার কেবল আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রদর্শন করতে পারবে।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তাদের সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণও সীমিত করা হয়েছে। ফরাসি এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেল আবিব। গাজা, লেবানন ও ইরান সংঘাতের পর থেকেই মূলত প্যারিস-তেল আবিব সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে।