কালীঘাট তৃণমূল ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে চলেছেন বীরভূমের প্রাক্তন জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল। বুধবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘উনি কানে দেখেন, চোখে শোনেন।’ সেই বিতর্কিত মন্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার রথযাত্রার দিন ফের সরাসরি তৃণমূল নেত্রীকে নিশানা করলেন ‘কেষ্ট’।
বোলপুরে রথের দড়িতে টান দেওয়ার পর নিচুপট্টির বাড়িতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অনুব্রত বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেগে ঘুমোলে কী আর সাড়া পাওয়া যায়?’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তৃণমূলের বর্তমান ভরাডুবির জন্য অন্য কাউকে নয়, সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দায়ী।
অনুব্রতের কথায়, ‘এই দলটাকে আমরা অনেক কষ্ট করে ক্ষমতায় এনেছিলাম। সিপিএমকে সরিয়ে বাংলায় পরিবর্তন এনেছিলাম। কলকাতার প্রতিটি সভায় হাজার হাজার কর্মী নিয়ে যেতাম। সেই ইতিহাস আমরা পুরনো কর্মীরা জানি। আজ দল যে জায়গায় পৌঁছেছে, তার জন্য আমি অন্য কাউকে নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করব।’ তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা আইপ্যাককেও তীব্র আক্রমণ করেন তিনি। অনুব্রতের দাবি, ‘কীসের আইপ্যাক? গ্রামের মানুষের ভাষা ওরা বোঝে? আইপ্যাক দিয়ে কোনওদিন সংগঠন তৈরি হয় না। সংগঠন তৈরি করেন কর্মীরা, যাঁরা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মানুষের পাশে থাকেন।’
২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস প্রসঙ্গেও নিজের ক্ষোভ উগরে দেন বীরভূমের এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, “আগে ২১ জুলাই ব্রিগেডে হত। আমরা হাজার হাজার মানুষ নিয়ে যেতাম। কেউ টাকা চাইত না। কর্মীরা ভোরবেলা মুড়ি খেয়ে সভায় যেত। অথচ সামনের সারিতে বসে থাকত সিনেমা আর সিরিয়ালের শিল্পীরা। কেন ওরা সামনে বসবে? দলের জন্য কী করেছে? বিনা পারিশ্রমিকে কোনও অনুষ্ঠানও তো করে না। তবে শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ, কাকলি ঘোষের মতো কয়েকজন ব্যতিক্রম। ওরা দলের জন্য কাজ করে।’

তবে মুখ্যমন্ত্রীকে এখনও পরামর্শ দিতেও দেখা গেল অনুব্রতকে। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সত্যিই বুদ্ধিমতী হন, তাহলে সবাইকে নিয়ে চলবেন। ২১ জুলাইয়ের সভায় এলে ভালো করবেন। কেউ তাঁকে আটকাবে না। দলটা আমরা সকলে মিলে গড়েছিলাম।’ শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়, বীরভূমের পাথর শিল্প এবং রাজস্ব নিয়েও সরব হন অনুব্রত। তাঁর দাবি, ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রতিদিন পাথর খাদান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হত। অথচ তিনি ফিরে আসার পর সেই অঙ্ক নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৪০ লক্ষ টাকায়।
কেষ্টর অভিযোগ, ‘আমি বারবার বলেছিলাম, বীরভূম থেকে যে রাজস্ব ওঠে, তা বীরভূমের উন্নয়নের কাজে খরচ করা হোক। কিন্তু তা হয়নি। শুধু পাথর নয়, বালি থেকেও বিপুল রাজস্ব আসে। ভুল সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব পরিস্থিতি না বোঝার কারণেই এই অবস্থা হয়েছে।’ অনুব্রত মণ্ডলের এই ধারাবাহিক আক্রমণ তৃণমূলের অন্দরের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। বিশেষ করে ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির আগে তাঁর এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।