নেপালে বিধ্বংসী বন্যায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে ৯০০ কর্মী

Spread the love

হিমালয়ের দেশ নেপালে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী বন্যা ও ধসের পর এক অভূতপূর্ব উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। দেশের অন্তত নয়টি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Hydropower Projects) থেকে নিখোঁজ ৯০০ জনেরও বেশি কর্মীকে উদ্ধারে সময় কাটছে চরম আশঙ্কায়। তবে পঞ্চম দিনে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হতেই উদ্ধারকাজে নতুন গতি এসেছে। নেপালি সেনাবাহিনী পরিচালিত বিশেষ উদ্ধার দল সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আপার ট্রিশুলি-৩A (Upper Trishuli-3A) জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গের মূল অংশ বা ‘ক্রাউন হেড’ (Crown Head) চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA)-র তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১০ জনে (নেপালে ৭৯৪ এবং তিব্বতে ১৬)। দুই দেশ মিলিয়ে এখনও ৩,০৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে একা নেপাল থেকেই নিখোঁজ ২,৫০২ জন। নিখোঁজদের তালিকায় নেপালি শ্রমিকদের পাশাপাশি বহু ভারতীয় এবং বিদেশী নাগরিকও রয়েছেন।

১. সেনাবাহিনীর এয়ারলিফটিং ও সুড়ঙ্গে প্রাণের খোঁজে মরিয়া অভিযান

আপার ট্রিশুলি-৩A প্রকল্প এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে নেপালি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখানে এক্সকাভেটর, বুলডোজার ও ভারী আর্থ-মুভিং যন্ত্রপাতি এয়ারলিফট করেছে। প্রবল বৃষ্টি ও কাদামাটির মধ্যেই সেনাবাহিনীর প্রকৌশলী ও টানেল বিশেষজ্ঞরা উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

  • ক্রাউন হেড আবিষ্কার ও গর্ত তৈরি: নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বাসনেত জানিয়েছেন, ট্রিশুলি ৩A-এর মূল ক্রাউন হেড অংশে ২x৩ ফুটের একটি মুখ তৈরি করা হয়েছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে সাত মিটার ব্যাসের জলাশয় সৃষ্টি হয়েছে, যা বিপজ্জনক গভীরতা পর্যন্ত উঠে এসেছে।
    • জীবনের লক্ষণ অনুসন্ধানে ব্যর্থতা: সেনাবাহিনীর একজন বিশেষ সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ জীবনের সন্ধানে ভেতরে প্রবেশ করলেও এখনও পর্যন্ত কাউকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। সুড়ঙ্গের ভেতরে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে উদ্ধারকারী দল যেন ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, তার জন্য গর্তটি আরও বড় করার প্রক্রিয়া চলছে।
    • অন্যান্য জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্ধার চিত্র: আপার ট্রিশুলি-১ প্রকল্পে প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন, যাদের মধ্যে ২৫৪ জনকে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে আপার ট্রিশুলি-৩B প্রকল্পে নিখোঁজ ১২২ জন শ্রমিকের মধ্যে ৯১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনও ৩১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

    ২. নিখোঁজের তালিকায় বহু ভারতীয় ও বিদেশী নাগরিক

    নেপাল সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৯২ জন বিদেশী নাগরিক রয়েছেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) জানিয়েছে যে, তারা ধারাবাহিকভাবে উদ্ধারকার্যে তদারকি করছে।

    • উদ্ধার ও নিখোঁজ ভারতীয়: মন্ত্রক সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত নেপালে আটকে পড়া ১৪৯ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও প্রায় ২৭৫ জন ভারতীয় এবং ১২৮ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন।
    • তিব্বত সীমান্তের চিত্র: চীন জানিয়েছে যে, তিব্বতের গায়রোং (Gyirong) অঞ্চলে নিখোঁজ ৫৪৬ জনের মধ্যে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশী নাগরিক রয়েছেন। এতে ৪৯ জন ভারতীয় ও ১০৪ জন নেপালি নাগরিক অন্তর্ভুক্ত।

    ৩. ভারতের কারিগরি সহায়তা ও উদ্ধারকারী দল প্রেরণ

    নেপালে এই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলায় ভারত দ্রুত কারিগরি ও ত্রাণ সহায়তা বৃদ্ধি করেছে। কাঠমান্ডুতে ৪টি বিশেষ ত্রাণ বিমান পাঠানো হয়েছে, যার মাধ্যমে ৬৮.৫ টন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে।

    পাশাপাশি, ভারত থেকে ১৩ সদস্যের বিশেষ সরঞ্জাম সমৃদ্ধ ভারতীয় সেনা সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল (Indian Army Tunnel-Rescue Team) এবং ১৯ সদস্যের ৬টি ফরেনসিক দল নেপালে পৌঁছে উদ্ধারকাজ এবং সনাক্তকরণ কাজে নেপালি বাহিনীকে সাহায্য করছে। নেপালের বিদেশ সচিব অমৃত বাহাদুর রাই জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হলো মানুষের জীবন বাঁচানো, নিখোঁজদের দ্রুত সনাক্ত করা এবং স্থানীয়দের পাশাপাশি সকল বিদেশী নাগরিককে জরুরি সাহায্য ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া।

  • নেপালের ইতিহাস ও পরিকাঠামোর ওপর এই বন্যা এক মারাত্মক আঘাত হেনেছে। কাদা ও জলে ডুবে যাওয়া অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়া ৯০০ কর্মী ও শ্রমিকের জীবনের লড়াইয়ে প্রতিটি মুহূর্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ। নেপালি সেনাবাহিনী, ভারতীয় সহায়তা দল এবং আন্তর্জাতিক পরিকাঠামোর যৌথ প্রচেষ্টায় এখন একটাই আশা—সুড়ঙ্গ থেকে যেন অলৌকিকভাবে জীবিতদের উদ্ধার করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *