বঙ্গে এখন ‘এসআইআর’ আবহ। তার সঙ্গেই সমর্থক হিসাবে উঠে আসছে আরও একটি শব্দবন্ধ। তা হল ‘সিএএ’। এই পরিস্থিতিতে সবথেকে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন মতুয়ারা। আর এই আবহে বড়মা বীণাপাণি দেবীর তিরোধান দিবসে মতুয়া সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যসভা নির্বাচনের মনোনয়ন পেশের কর্মব্যস্ততার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে মতুয়াদের পরিচয় নিয়ে রাজনীতি করছে কেন্দ্র।
এসআইআর ও মতুয়া সমাজ
মতুয়াদের নাগরিকত্ব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। বিশেষ করে মতুয়া মহাসঙ্ঘের অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব প্রশ্নে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। অনেক মতুয়া পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভারতে থাকলেও তাদের কাছে প্রাথমিক নাগরিকত্ব নথি (যেমন পুরোনো দলিল বা কাগজ) নেই। তাই নাগরিকত্বের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।সম্প্রতি এসআইআর-এর যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগণা ও নদিয়া-সহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৬৩ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে, যার মধ্যে বড় অংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের। বহু নামকে রাখা হয়েছে ‘বিচারাধীন’ পর্যায়ে। অথচ বনগাঁ, রানাঘাট, বারাসত, গাইঘাটা মতুয়া ভোট বড় ফ্যাক্টর। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই মতুয়াদের নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু এবার এসআইআর আবহে তা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী?
এক্স বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী বড়মার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান এবং মতুয়া সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের কথা তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শে মতুয়া মহাসংঘ বাংলার সামাজিক সংস্কার ও নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দলিত ও অবহেলিত মানুষের অধিকার রক্ষা, শিক্ষার প্রসার এবং জাতপাতহীন সমাজ গড়ার আন্দোলনে বড়মা বীণাপাণি দেবীর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বড়মার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মিক ও ব্যক্তিগত। তিনি বলেন, বড়মার চিকিৎসা বা অন্য কোনও প্রয়োজনে তিনি যখনই ডেকেছেন, তিনি ছুটে গিয়েছেন। তাঁর সামাজিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রাজ্য সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছিল বলেও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।

এছাড়াও মতুয়া সমাজের উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন তিনি। মতুয়া বিকাশ পর্ষদ ও নমঃশূদ্র বিকাশ পর্ষদ গঠন, হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা, ঠাকুরনগরে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, গাইঘাটায় পি আর ঠাকুর সরকারি কলেজ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব ইস্যুতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে কটাক্ষ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের চক্রান্তে আজ এক অস্থির ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে মতুয়া ভাই-বোনদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা পুরুষানুক্রমে এদেশের নাগরিক, আজ তাঁদের নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে।’ তিনি স্পষ্ট জানান, বাংলার মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই চেষ্টার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই চলবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তা এমন এক সময়ে এল যখন রাজ্যজুড়ে এসআইআর তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিক্ষোভ বাড়ছে।
‘সিএএ’
২০১৯ সালে কেন্দ্র সরকার সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাশ করে। এই আইনে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। ভারতীয় জনতা পার্টি দাবি করে, এই আইনের ফলে মতুয়া শরণার্থীরা সহজে নাগরিকত্ব পাবেন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বলে, মতুয়ারা ইতিমধ্যেই ভারতের নাগরিক; নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই এবং সিএএ-র মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। তবে তৃণমূলের সিএএ বিরোধী প্রচারের জন্যই এই অবস্থা বলছেন বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার। তাঁর বক্তব্য, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের কথা বিভ্রান্ত হয়ে, অনেকে ভয়ে ফর্ম ফিলাপ করেননি। তৃণমূল ভয় দেখিয়েছিল, এটাতে ফর্ম ফিলআপ করলে স্বাস্থ্য সাথী বন্ধ হয়ে যাবে, লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হয়ে যাবে, ভয়ে করেনি। এখন সবাই বুঝতে পারছে ভুল হয়ে গিয়েছে। এখন সবাই শেষের দিকে দৌড়াচ্ছে।’