ভারতের নৌ-সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পথে বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলেছে। বহু প্রতীক্ষিত প্রজেক্ট-৭৫আই (Project-75I) চুক্তি আগামী মাসের মধ্যেই সই হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ভারতে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ফিলিপ অ্যাকারম্যান। প্রায় ৮০০ কোটি ইউরো বা ৯০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই প্রকল্পের আওতায় ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ছয়টি প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন দেশেই নির্মাণ করা হবে।
এক শিল্প সম্মেলনের ফাঁকে অ্যাকারম্যান জানান, জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS) এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাবমেরিন নির্মাণই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর ফলে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রচলিত সাবমেরিন বহর আরও আধুনিক ও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের ভিত্তি হবে জার্মানির অত্যাধুনিক টাইপ-২১৪ সাবমেরিন। এটি এয়ার ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তিসম্পন্ন ডিজেল-ইলেকট্রিক অ্যাটাক সাবমেরিন। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, দীর্ঘ সময় পানির নীচে ভেসে না উঠেই অভিযান চালাতে পারে সাবমেরিনটি। ফলে শত্রুপক্ষের রাডার বা নজরদারি এড়িয়ে গোপনে অভিযান পরিচালনা করা অনেক সহজ হয়।
টাইপ-২১৪ সাবমেরিনের দৈর্ঘ্য ৬৫ মিটার এবং পানির উপরে এর ওজন প্রায় ১,৬৯০ টন, আর পানির নীচে প্রায় ১,৮৬০ টন। এতে রয়েছে দুটি এমটিইউ ডিজেল ইঞ্জিন, একটি সিমেন্সের বৈদ্যুতিক মোটর এবং হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলভিত্তিক এআইপি ব্যবস্থা। এই উন্নত প্রযুক্তির ফলে সাবমেরিনটি টানা প্রায় তিন সপ্তাহ পানির নীচে থাকতে সক্ষম। এর মোট অপারেশনাল সহনশীলতা প্রায় ৮৪ দিন এবং প্রায় ১২ হাজার নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত যাত্রা করতে পারে।
অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকেও টাইপ-২১৪ অত্যন্ত শক্তিশালী। এতে রয়েছে আটটি ৫৩৩ মিলিমিটার টর্পেডো টিউব, যেখান থেকে আধুনিক হেভিওয়েট টর্পেডো এবং সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব। পাশাপাশি রয়েছে অত্যাধুনিক সোনার, কমব্যাট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, নেভিগেশন রাডার এবং টর্পেডো প্রতিরোধ ব্যবস্থা। বিশেষ বাহিনীর গোপন অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই সাবমেরিন ব্যবহার করা যাবে।

সাবমেরিনটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এক্স-রাডার নকশা, যা পানির নীচে আরও ভালো নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত গতিপথ পরিবর্তনের সুবিধা দেয়। পাশাপাশি এর শব্দ ও চৌম্বকীয় স্বাক্ষর অত্যন্ত কম হওয়ায় শত্রুপক্ষের নজরে পড়ার সম্ভাবনাও অনেক কম।
ভারত ও জার্মানির মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত হলে ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং উন্নত সাবমেরিন নির্মাণ প্রযুক্তিতে ভারতের আত্মনির্ভরতার পথ আরও মজবুত হবে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মত।