ভারতের সবথেকে দূষিত অঞ্চলগুলির মধ্যে আছে পশ্চিমবঙ্গ। সম্প্রতি প্রকাশিত ২৫ বছরের (২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল) স্যাটেলাইট ছবি পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণার রিপোর্ট অনুযায়ী, সমগ্র ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির মধ্যে দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে সর্বোচ্চ পিএম (Particulate Matter) দূষণ অঞ্চলের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে। আরও আশঙ্কার কথা হলো, এই দূষণের থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনও।
২৫ বছরের গবেষণায় স্পষ্ট দূষণের গতিপ্রকৃতি
কলকাতার ‘বোস ইনস্টিটিউট’-র অধ্যাপক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং গবেষক সৌমেন রাউলের যৌথ নেতৃত্বে এই গবেষণা চালানো হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছরের উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট চিত্র ও তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘অ্যাটমোস্ফেরিক এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় মূলত ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি, হিমালয় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বায়ুদূষণের একটি সামগ্রিক ছবি তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণার ফলাফল স্পষ্ট জানাচ্ছে, দক্ষিণবঙ্গ ও প্রতিবেশী রাজ্য বিহার বর্তমানে এই অঞ্চলের সামগ্রিক বায়ুদূষণ সংকটের মূল উপকেন্দ্র বা ‘হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে পিএম দূষণের মাত্রা পূর্ববর্তী দশকের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিকারক কার্বনসমৃদ্ধ অ্যারোসলের উপস্থিতি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে।
যানবাহন বা শিল্প নয়, আসল খলনায়ক ‘বায়োমাস’ ও বর্জ্য
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে দূষণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ শিল্প বা যানবাহনের ধোঁয়া নয়; বরং গ্রামীণ এলাকায় বায়োমাস পোড়ানো এবং শহুরে এলাকায় কঠিন বর্জ্য পোড়ানো। ‘জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি’ (এনসিপি) পরবর্তী সময় সামগ্রিক পিএম মাত্রায় কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও বায়োমাস পোড়ানো থেকে সৃষ্ট দূষণ কমেনি। ফলে পশ্চিমবঙ্গ এখনও কার্বন-সমৃদ্ধ অ্যারোসল দূষণের একটি বড় হটস্পট হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক অভিজিৎ বলেন, ‘পূর্ব ইন্দো- গাঙ্গেয় সমভূমি এবং ক্রমশ উত্তর-পূর্ব ভারত বায়ুদূষণের অসম ভার বহন করছে, এবং এই দূষণের প্রধান কারণ প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বায়োমাস পোড়ানো। ২৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেত হিসেবে উঠে এসেছে।’

দ্বিমুখী সংকটে সুন্দরবন: জরুরি পদক্ষেপের দাবি
এই গবেষণায় সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনকে নিয়ে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি, উপকূলীয় বন্যা, তীব্র ভূমিক্ষয় এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা হারানোর মতো বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। তার ওপর এখন যুক্ত হয়েছে বিষাক্ত বাতাস।গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চলকে আর অবহেলা করা চলে না। ভারতের ‘জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি’-এর আওতায় সাধারণত দূষিত বড় শহরগুলিকে রাখা হয়। কিন্তু সুন্দরবনের মতো গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকাগুলি এই তালিকার বাইরে থাকায় কোনো সরকারি নজরদারি বা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। গবেষকরা অবিলম্বে সুন্দরবনকে এই পরিচ্ছন্ন বায়ু মিশনের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বিষাক্ত বাতাস পৌঁছাচ্ছে হিমালয়েও
গবেষণায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ‘ট্র্যাজেক্টরি মডেলিং’ পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও বাংলাদেশের বাতাসে তৈরি হওয়া এই অ্যারোসল দূষণ কেবল স্থানীয় এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বায়ুপ্রবাহের কারণে এই বিষাক্ত বাতাস নিম্ন ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি থেকে উড়ে চলে যাচ্ছে সুদূর পূর্ব হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে। পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর হিমালয়ের পাহাড়ি এলাকায় এখনও পর্যন্ত কোনও সংগঠিত পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি নেই, ফলে সেখানকার পরিবেশও এখন বড়সড় বিপদের মুখে।