কলকাতা হাই কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্কে নতুন দিশা দেখাল। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কাউকে বিদেশি বলে সন্দেহ করা হলে নিজের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরই। রাষ্ট্র বা প্রশাসনের ওপর সেই দায় বর্তায় না। একই সঙ্গে আদালত আরও জানিয়েছে, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ব্যাঙ্কের নথি কিংবা জমির দলিল এককভাবে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করেছে।
মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিকে ঘিরে দায়ের হওয়া একটি মামলার শুনানিতে এই মন্তব্য করে আদালত। মামলাকারী সুমন মোল্লার অভিযোগ, গত ১৮ জুন তাঁর ভাইপোকে বেআইনিভাবে আটক করে পুলিশ ডিটেনশন শিবিরে নিয়ে যায়। তাঁর দাবি, ভাইপো ভারতীয় নাগরিক। সেই দাবির সমর্থনে আদালতে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ব্যাঙ্কের পাসবই, দাদুর আমলের জমির নথি, পারিবারিক বিভিন্ন কাগজপত্র এবং বাবার এক আত্মীয়ের পাসপোর্টও জমা দেওয়া হয়।
তবে আদালত জানিয়ে দেয়, এই নথিগুলির কোনওটিই একা বা সম্মিলিতভাবে ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আদালতের মতে, এগুলি মূলত পরিচয়পত্র বা প্রশাসনিক নথি। নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে এগুলিকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ধরা যায় না। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, নাগরিকত্ব নির্ধারিত হবে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫৫ এবং ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬-এর ৯ নম্বর ধারার ভিত্তিতে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা প্রমাণ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপরই বর্তায়।
শুনানিতে রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মামলাকারীর ভাইপো বাংলাদেশের নাগরিক। পুলিশ তাঁকে আটক করার পর তিনি নিজেই বাংলাদেশি হওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন এবং সেই স্বীকারোক্তির ভিডিও রেকর্ডিংও রয়েছে। আইন মেনেই তাঁকে ডিটেনশন শিবিরে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে ৬০ দিনের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকত্বের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ জমা দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তিনি আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনও নথি পেশ করতে পারেননি বলে রাজ্যের দাবি।

অন্যদিকে, আবেদনকারীর আইনজীবী আদালতে জানান, এর আগে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ওই ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে এবং মামলাটি এখনও বিচারাধীন। আইনজীবীর যুক্তি, দাদুর আমলের জমির রেকর্ড, ভোটার ও আধার-সহ একাধিক সরকারি নথি থাকায় তাঁর মক্কেল ভারতীয় নাগরিক বলেই ধরে নেওয়া উচিত। তিনি আরও দাবি করেন, এত বিপুল সংখ্যক সরকারি নথি জাল করে তৈরি করা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।