রাজ্যের ভোটের আবহে রাজ্যসভার প্রার্থীপদ নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল চর্চা হয়েছে। আর শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা আর চাঁদের হাটে জমজমাট বিধানসভা চত্বর। বৃহস্পতিবার ছিল এ রাজ্য থেকে রাজ্যসভার নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে রূপোলি পর্দার ‘মিনিস্টার’ থেকে বাস্তবে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখা কোয়েল মল্লিক, আর অন্যদিকে দুঁদে প্রাক্তন আইপিএস রাজীব কুমার, রাজ্যের মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ও আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী- শাসকদলের চার প্রার্থীর সঙ্গেই এদিন মনোনয়ন দাখিল করলেন বিজেপির রাহুল সিনহাও। সংখ্যার বিচারে তৃণমূলের চারটি এবং বিজেপির একটি আসনে জয় এখন সময়ের অপেক্ষা।
‘নতুন ইনিংস’ নিয়ে উৎসাহিত কোয়েল
এদিন বিধানসভায় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক। এতদিন বিধানসভা নির্বাচন কিংবা লোকসভা নির্বাচনে তারকাদের প্রার্থী বানিয়ে চমকে দিত তৃণমূল। এমনকী, অনেক শিল্পীরা হয়ত টিকিট পান না, তবে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন। কিন্তু কোয়েলকে সেই অর্থে কোনওদিনই দেখা যায়নি। রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ হাতে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন গিয়েছিলেন ঠিকই, তবে কোয়েলকে কোনওদিনই দেখা যায়নি কোথাও। সেই অভিনেত্রীরই নাম যখন ঘোষণা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই তা চমকপ্রদ ছিল সকলের কাছে। বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা দিয়ে বেরিয়ে অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি চিরকাল মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলাম। সেই সুযোগ, সেই দায়িত্ব আমি পেলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘অসাধারণ লাগছে। এটা একটা বিশাল বড় দায়িত্ব। সকলের কাছ থেকে আর্শীবাদ চাইব, যাতে মানুষের উপকারে লাগতে পারি। মানুষকে সাহায্য করতে পারি, ভাল রাখতে পারি।’ গ্ল্যামার জগৎ থেকে সংসদীয় রাজনীতির উচ্চকক্ষে প্রবেশের এই চ্যালেঞ্জকে হাসিমুখেই গ্রহণ করেছেন তিনি।
সাম্যের বার্তা মেনকা গুরুস্বামীর
এদিন মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মেনকা গুরুস্বামী এদিন সাম্যের বার্তা দেন। ভারতীয় সংবিধান যে সম অধিকারের কথা বলে, সেটা রক্ষা করাই আগামিদিনে তাঁর কর্তব্য হবে বলে উল্লেখ করেন আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘আমি সংবিধান মেনে কাজ করার পক্ষে, সে সংসদ হোক বা আদালত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমায় সুযোগ দিয়েছেন রাজ্যসভায়। তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। সংবিধান মানুষকে সমান অধিকার দেয়। সেই সমান অধিকারের জন্য লড়াই করার সুযোগ পেলাম সংসদের উচ্চ কক্ষে।’

বাবুল সুপ্রিয়র পারফরম্যান্স
অন্যদিকে বাবুল সুপ্রিয় জানান, তাঁর কাছে পুরোটাই একটা পারফরম্যান্স। তিনি বলেন, ‘ভোটে জিতে এসে কাজ করা একটা প্রিপেড ব্যবস্থা। আগে ভোটে জেতা, তার পরে মানুষের জন্য কাজ করা। আগে রিকোয়েস্ট আসত গানের। সেখানে পারফর্ম করতে হত। পরে লোকসভায় জিতে কাজ করা শুরু করি, মানুষের রিকোয়েস্ট নিয়ে পারফর্ম শুরু করি। তারপর আবার মন্ত্রিসভায়। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আবার আমার উপর ভরসা করেছেন। মানুষের জন্য পারফর্ম করব। সবটাই পারফরম্যান্স।’
কী বললেন রাজীব কুমার?
এদিন মাদার টেরিজার একটি কোডকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমকে রাজীব কুমার বলেন, ‘মাদারের একটা কথা আছে, আমি বিশ্বাস করি ঈশ্বর আমায় এমন কোনও দায়িত্ব দেবেন না, যা আমি সামলাতে পারব না। তিনি যেন আমাকে এতটা বিশ্বাস না করেন।’ একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানান তিনি। এরপর আর একটিও মন্তব্য করেননি তিনি। তবে মাদারের এই উদ্ধৃতির মধ্যেই অনেক কিছু বুঝিয়েছেন তিনি। রাজীব তবে কি এটা বোঝাতে চাইলেন? তাঁর ক্ষমতা সীমিত। তাঁর থেকে যেন অধিক প্রত্যাশা করা না হয়। নিজের দায়িত্ব সামলাবেন যেমন আগে সামলেছেন, কিন্তু অত্যাধিক প্রত্যাশা পূরণ হয়ত তিনি করতে পারবেন না।
রাহুল সিনহার বাধা
অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী রাহুল সিনহা মনোনয়ন জমা দেন বেশ কিছুটা দেরিতে। যদিও তিনি তৃণমূল প্রার্থীদের আগেই বিধানসভায় এসে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘরে নিজের মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দেন। বিরোধী দলনেতা ছাড়াও রাহুলের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এ ছাড়াও বিজেপির বেশ কিছু বিধায়কও রাহুলের মনোনয়ন পর্বে উপস্থিত ছিলেন। তবে বারবার নথিপত্র ঠিক মতো জোগাড় না হওয়ায় মনোনয়ন জমা দিতে বিলম্ব হয়। এক সময় অধৈর্য হয়ে পড়েন রাহুল। কিন্তু বিজেপি পরিষদীয় দল এবং রাজ্য সংগঠনের উদ্যোগে মনোনয়ন সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা হলে শেষে দুপুর ২.৩০-এর কিছু আগে মনোনয়ন জমা দেন রাহুল।