মাচার অনুষ্ঠান বা খোলা মঞ্চের শো মানেই জমজমাট আলো আর শ্রোতাদের উন্মাদনা। কিন্তু এই আলোর পেছনেই লুকিয়ে থাকে অনিদ্রা, ক্লান্তি আর পথ দুর্ঘটনার এক অন্ধকার সমীকরণ। এবার সেই সমীকরণ বদলাতে এবং সঙ্গীতজগতের সঙ্গে যুক্ত ‘মিউজিশিয়ান আঙ্কেল’ ও ‘ড্রাইভার আঙ্কেল’দের জীবন সুরক্ষিত করতে সরাসরি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ হলো মেদিনীপুরের খুদে প্রতিভাবান শিল্পী অঙ্কনা। সমাজমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি পোস্ট করে সারেগামাপা খ্য়াত এই খুদে শিল্পী একগুচ্ছ জোরালো দাবি পেশ করেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অঙ্কনার ‘আবদার’:
নিজেকে গর্বিত মেদিনীপুরবাসী হিসেবে পরিচয় দিয়ে অঙ্কনা মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র তথা মুখ্যমন্ত্রীকে জানায়, রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় মেদিনীপুরে। আর তাই মেদিনীপুরের মাটি থেকেই সে এই বদলের ডাক দিতে চায়। অঙ্কনার মূল দাবি— রাতের বেলার অনুষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হোক। তার প্রস্তাব, গরমের সময় রাত ১২টা এবং শীতকালে রাত ১১টার মধ্যে সমস্ত অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে শেষ করতে হবে। সেই সঙ্গে একটি অনুষ্ঠান ঠিক কতক্ষণ চলবে, তাও নির্দিষ্ট করা হোক।
কেন এই নিয়ম দরকার? অঙ্কনা দেখাল ৪টি বড় কারণ:
১. মিউজিশিয়ানদের চরম ক্লান্তি: অঙ্কনা লিখেছে, “সময়ে অনুষ্ঠান শুরু আর শেষ হলে সবাই একটু বিশ্রামের সময় পাবেন, বিশেষ করে মিউজিশিয়ান আঙ্কেলরা। আমরা শিল্পীরা নিজেদের গান গেয়ে চলে এলেও, ওনারা ছুটি পান না। ওনাদের টানা বাজিয়ে যেতে হয়।”
২. সুস্থ শ্রোতার অভাব: রাত যত বাড়ে, মণ্ডপে সুস্থ শ্রোতার সংখ্যা তত কমতে থাকে। ফলে অনেক সময় শিল্পীদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমন কিছু গান গাইতে বাধ্য করা হয়, যা তাঁদের ঘরানার সঙ্গে মেলে না।

৩. মদ্যপ উদ্যোক্তাদের তাণ্ডব ও অশান্তি: গভীর রাতের অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। অঙ্কনার কথায়, “দেরিতে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানগুলোতে আয়োজক কমিটির কিছু মেম্বার বেসামাল (মদ্যপ) অবস্থায় থাকেন যে নিজেদের মধ্যেই ঝামেলা বাধিয়ে বসেন এবং তার দায় গিয়ে পড়ে ব্যান্ডের ওপর।”
৪. পথ দুর্ঘটনা ও ঘুমন্ত চালক: ভোর রাতে অনুষ্ঠান শেষ করে যখন দল বাড়ি ফেরে, তখন ক্লান্তিতে গাড়ির চালকদের ঘুম চলে আসে। যার ফলে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে খুদে শিল্পী জানিয়েছে, গত ১২ মে অনুষ্ঠান সেরে ফেরার পথে গোপালের কৃপায় সে নিজেও এক বড়সড় দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে।
সুস্থ সংস্কৃতির ডাক:
চিঠির শেষে অঙ্কনা লিখেছে, সুস্থ এবং সুন্দর অনুষ্ঠান করে শ্রোতাদের আনন্দ দিতে পারলে শ্রোতার চেয়েও বেশি খুশি হন শিল্পীরা। আর তাই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তার সশ্রদ্ধ অনুরোধ, তিনি যেন এই বিষয়ে কোনো কড়া সিদ্ধান্ত নেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে বড় বড় তারকারা অনেক সময় মাচার শো-র বিশৃঙ্খলা নিয়ে মুখ খুলতে ভয় পান, সেখানে মেদিনীপুরের এই খুদে শিল্পীর এমন পরিণত ও যুক্তিপূর্ণ চিঠি টলিপাড়া থেকে শুরু করে সঙ্গীত দুনিয়ায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। এখন দেখার, ‘মেদিনীপুরের মেয়ে’র এই আন্তরিক আবদারে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেন কি না।