Rath Yatra 2026: রথযাত্রা উৎসব এবং আগামী শ্রাবণ মাসের পুণ্যার্থীদের জন্য একগুচ্ছ বড়সড়ো ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার রাজ্যের বিধায়ক, জেলাশাসক এবং প্রশাসনের সর্বস্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল সমন্বয় বৈঠক করেন তিনি। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, রাজ্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সরকারের কর্তব্য। আর সেই লক্ষ্যেই এবার সরকারিভাবে রথযাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে চলেছে রাজ্য প্রশাসন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ইসকন, ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো শীর্ষস্থানীয় আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সন্ত সমাজের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া হলেও দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও পরম্পরাকে সযত্নে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
রথযাত্রায় সক্রিয় সরকারি অংশগ্রহণ
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, পশ্চিমবঙ্গ কেবল এক সময় ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানীই ছিল না, এটি শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী প্রণবানন্দ, মা সারদামণি ও রানি রাসমণির মতো মহামানবদের পুণ্যভূমি। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ কিংবা দার্জিলিং থেকে দিঘা- এ রাজ্যের রথযাত্রা উৎসব শত শত বছরের পুরনো পরম্পরা ও আনন্দের মিলনক্ষেত্র। ঐতিহ্যের এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে এবারই প্রথম রাজ্য সরকার রথযাত্রায় সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, রথযাত্রা উৎসব পালনের জন্য প্রশাসনের তরফ থেকে সবরকম সহায়তা দেওয়া হবে। রাজ্যের ৭৫টি ঐতিহ্যপূর্ণ রথযাত্রা মেলায় বিশেষ ‘সেবা কেন্দ্র’ গড়ে তুলবে প্রশাসন। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের পরিচালনায় এই কেন্দ্রগুলি সংশ্লিষ্ট রথযাত্রা কমিটি, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে পরিচালনা করবে।
এর পাশাপাশি, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী রাজ্যের ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও এদিন শুরু হয়। এই অনুদানের অর্থ মূলত পুরনো ও কাঠের নির্মিত রথগুলির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করার জন্য কমিটিগুলিকে অনুরোধ জানান তিনি। আগামী দিনে এই তালিকা আরও ত্রুটিমুক্ত ও সম্প্রসারিত করার আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম বছর তালিকা তৈরির ত্রুটি থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন… আগামিদিনে ত্রুটিমুক্ত তালিকা তৈরির চেষ্টা করা হবে। এখন যে কাজ শুরু হলো, তা আগামীতে মহীরূহে পরিণত হবে।’
১০০০ কোটির ‘তীৰ্থক্ষেত্ৰ সার্কিট’
এবারের রাজ্য বাজেটে ধর্মীয় পর্যটন ও প্রাচীন মন্দিরগুলির সংস্কারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক কিরীটেশ্বরী মন্দির-সহ রাজ্যের প্রাচীন ও হেরিটেজ মন্দিরগুলির পুনর্সংস্কারের জন্য ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’ নামে একটি নতুন রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। আগামী দুই বছর ধরে এই সার্কিটের অধীনে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হবে এবং এই উদ্দেশ্যে বর্তমান অর্থবর্ষে প্রাথমিকভাবে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো উন্নয়নেও সরকার অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে বলে জানান শুভেন্দু অধিকারী। ভারত সেবাশ্রম সংঘ পরিচালিত হাসপাতালগুলিকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ যোজনার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন পরিচালিত বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিদ্যালয়গুলির উন্নয়নমূলক প্রস্তাবগুলি গ্রহণ করেছে সরকার। কলকাতার শিমলা স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের পবিত্র জন্মভিটের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে সরকারের তরফ থেকে ৫ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘করপাস ফান্ড’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

শ্রাবণী মেলা ও জলযাত্রীদের জন্য অভিনব উদ্যোগ
এবারের শ্রাবণ মেলা নিয়েও এক চমকপ্রদ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আপাতত রাজ্যের তিনটি বিখ্যাত শিব মন্দিরকে বিশেষ পরিকল্পনার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে-হুগলির তারকেশ্বর ধাম, জলপাইগুড়ির জল্পেশ মন্দির এবং আলিপুরদুয়ারের জয়ন্তী এলাকার একটি শিব মন্দির। পুণ্যার্থীদের সুরক্ষায় শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর যাওয়ার পথে প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুলিশের সহায়তা ক্যাম্প এবং বিশ্রামের জায়গা তৈরি করা হবে। এই অস্থায়ী শিবিরে পুণ্যার্থীদের বিশ্রামের জায়গা, ওআরএস, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পের ব্যবস্থা থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আবহাওয়া ঠিক থাকলে শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার জল ঢালতে যাওয়া পুণ্যার্থীদের ওপর সরকারি হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি করা হবে। নবান্নের এই বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর আগামী কর্মসূচিও ভাগ করে নেন। তিনি জানান, আগামী ১৪ তারিখ তিনি স্বয়ং তারকেশ্বর ধামে উপস্থিত থাকবেন এবং আগামী ১৬ তারিখ ইসকন-এর বিশেষ আমন্ত্রণে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসবে শামিল হবেন। বক্তব্যের শেষে সকলকে রথযাত্রার শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি দিয়ে ভাষণ শেষ করেন।