বৃষ্টির শেষে অথবা শীতের শুরুর সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই অসংখ্য শ্যামাপোকা আলোর উৎসগুলির চারপাশে ভিড় করে। রাতের বেলা আলোর দিকে তাদের এই তীব্র আকর্ষণ বিজ্ঞানীদের কাছেও এক বড় রহস্য। কিন্তু পরদিন সকালেই সেই পোকাগুলোকে কেন মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়? এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এক করুণ পরিণতি।
শ্যামাপোকার আলোর প্রতি আকর্ষণ (ফোটোট্যাক্সিস)
শ্যামাপোকারা আলোর প্রতি যে আকর্ষণ দেখায়, তাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় পজিটিভ ফোটোট্যাক্সিস (Positive Phototaxis) বলা হয়। তবে কৃত্রিম আলোর প্রতি তাদের এই আকর্ষণ তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর।
- নেভিগেশনের ভুল (Transverse Orientation): বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শ্যামাপোকা তাদের উড়ার দিক ঠিক করার জন্য চাঁদের আলোর ওপর নির্ভর করে। চাঁদ বহু দূরে থাকায় চাঁদের আলো তাদের কাছে সমান্তরাল রশ্মি হিসেবে আসে। পোকাগুলো তাদের উড়ার সময় চাঁদের আলোকে একটি নির্দিষ্ট কোণে রেখে দিক ঠিক করে।
- কৃত্রিম আলোর বিভ্রান্তি: যখন পোকাগুলো কাছাকাছি থাকা কোনো কৃত্রিম আলোর (যেমন বাল্ব বা লণ্ঠন) কাছে আসে, তখন চাঁদের আলোর মতো সেটি সমান্তরাল রশ্মি হিসেবে আসে না। পোকাগুলো দিক ঠিক করার জন্য কৃত্রিম আলোকে একটি নির্দিষ্ট কোণে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু আলোটি খুব কাছে থাকায়, তারা যতই দিক ঠিক করতে যায়, ততই পেঁচিয়ে সেই আলোর উৎসের দিকেই ঘুরতে শুরু করে। এটি তাদের এক ধরনের অনিবার্য ফাঁদ।
সকালে মৃত অবস্থায় থাকার কারণ
পরদিন সকালে শ্যামাপোকাদের মৃত অবস্থায় পড়ে থাকার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে:
১. ক্লান্তি ও জলশূন্যতা: সারারাত ধরে পোকাগুলো আলোর চারপাশে দ্রুত গতিতে পাগলের মতো উড়তে থাকে। এই তীব্র পরিশ্রমের ফলে তারা চরমভাবে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্রমাগত ডানা ঝাপটানোর ফলে তারা শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং অনেকেই জলশূন্যতায় ভোগে।
২. তাপ ও পুড়ে যাওয়া: আলোর উৎসের খুব কাছে চলে আসায় বা সরাসরি তা স্পর্শ করার ফলে পোকাগুলো সেই তীব্র তাপ সহ্য করতে না পেরে মারা যায়। অনেক সময় বৈদ্যুতিক বাল্বের তাপে তাদের ডানা বা শরীর পুড়ে যায়।

৩. শিকারীর কবলে: আলোতে ভিড় জমানোর কারণে তারা টিকটিকি, মাকড়সা, বা অন্য শিকারী প্রাণীদের সহজ শিকারে পরিণত হয়।
৪. শারীরিক দুর্বলতা: শ্যামাপোকার জীবনকাল সাধারণত খুব কম হয়। সারারাত আলোর প্রতি এই তীব্র আকর্ষণের কারণে তারা স্বাভাবিক খাবার বা বিশ্রামের সুযোগ পায় না, ফলে তাদের জীবনচক্র দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
এইভাবেই রাতের আলোর তীব্র আকর্ষণ শ্যামাপোকাদের জীবনচক্রকে অপ্রত্যাশিতভাবে সংক্ষিপ্ত করে দেয়।