Himalayan skeleton lake genetic test: হিমালয়ের ১৬,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এক রহস্যময় জলাশয়—রূপকুণ্ড হ্রদ (Roopkund Lake)। ভারতের উত্তরাখণ্ডের এই হ্রদটি বিশ্বজুড়ে ‘কঙ্কাল হ্রদ’ বা ‘স্কেলিটন লেক’ (Skeleton Lake) নামে পরিচিত। কারণ, এই বরফাবৃত হ্রদের গভীরে এবং তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শত শত মানুষের হাড়গোড় ও কঙ্কাল। দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—কারা ছিলেন এই মানুষগুলো? কীভাবে একসঙ্গে এত মানুষ এখানে মারা গেলেন?
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক জিনবিজ্ঞানীদের (Geneticists) একটি দল এই হ্রদ থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা (DNA Analysis) করেন। সেই জিনগত গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের সম্পূর্ণ চমকে দিয়েছিল। জানা গেছে, রূপকুণ্ডের এই কঙ্কালগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের বা একই সময়ের নয়, বরং তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অত্যন্ত ভিন্ন এক ঐতিহাসিক যাত্রাপথ অতিক্রম করে এখানে এসেছিলেন। এই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারের পেছনের বিজ্ঞান ও ইতিহাস আজ জেনে নিন।
বহু বছর ধরে একটি প্রচলিত লোকবিশ্বাস ছিল যে, নবম শতাব্দীতে কোনো এক বিশাল রাজকীয় দল অথবা কোনো এক ভয়াবহ তুষারঝড়ের কবলে পড়ে একদল ভারতীয় সেনা বা তীর্থযাত্রী এখানে একসঙ্গে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের সেই ল্যান্ডমার্ক জিনগত গবেষণা এই সমস্ত পুরনো ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।
গবেষকরা হ্রদ থেকে সংগৃহীত ৩৮টি কঙ্কালের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং (Genome Sequencing) এবং রেডিওকার্বন ডেটিং (Radiocarbon Dating) করেন। ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় কঙ্কালগুলোকে প্রধানত তিনটি স্পষ্ট জিনগত গোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন, যা প্রমাণ করে এই মানুষেরা ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশ ও শতাব্দী থেকে এখানে এসে পৌঁছান।

১. তিনটি ভিন্ন জিনগত গোষ্ঠী (Three Distinct Genetic Groups)
গ্রুপ এ (দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত): গবেষণায় দেখা গেছে, কঙ্কালগুলোর মধ্যে ২৩টি কঙ্কাল ছিল বর্তমান ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জিনগত কাঠামোর সাথে মিলসম্পন্ন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরা সবাই কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন না, বরং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের উপগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য এদের ডিএনএ-তে মিলেছে।
গ্রুপ বি (পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় বা গ্রিস-ক্রিট অঞ্চলের বাসিন্দা): এই গবেষণার সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ মোড় ছিল এটিই। বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে তুলে দিয়ে দেখা যায়, হ্রদের ১৪টি কঙ্কালের ডিএনএ-র সাথে বর্তমান গ্রিস (Greece) এবং ক্রিট (Crete) দ্বীপের মানুষের জিনগত মিল রয়েছে! অর্থাৎ, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ সুদূর হিমালয়ের এই দুর্গম হ্রদে এসে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
গ্রুপ সি (পূর্ব এশীয় বংশোদ্ভূত): অবশিষ্ট একটি কঙ্কালের ডিএনএ-তে পূর্ব এশিয়ার (Southeast Asian) মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যের হদিস মিলেছে।
২. সময়ের বিশাল ব্যবধান: এক হাজার বছরের ফারাক!
রেডিওকার্বন ডেটিং-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, এই মানুষগুলো কোনো একটি একক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে মারা যাননি।
দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত (গ্রুপ এ) মানুষের কঙ্কালগুলো মূলত খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর (7th to 10th Century) মধ্যবর্তী সময়ের। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১,২০০ বছর আগে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল। অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের (গ্রুপ বি) এবং পূর্ব এশিয়ার মানুষের কঙ্কালগুলো অনেক পরের—খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর (19th Century), যা আজ থেকে মাত্র ২০০ বছর আগের ঘটনা! এক হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানবগোষ্ঠী একই দুর্গম হ্রদে এসে কেন এবং কীভাবে মারা গেলেন, তা বিজ্ঞানীদের আরও বড় ধাঁধার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মৃত্যুর কারণ এবং রহস্যের নতুন দিক
হাড়ের আঘাতের ধরণ পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীদের অনুমান, এখানে কোনো যুদ্ধ বা মহামারীর কারণে মৃত্যু ঘটেনি। কঙ্কালগুলোর মাথার খুলি এবং কাঁধের হাড়ে ভারী গোল কোনো বস্তুর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে কোনো তীব্র হেইলস্টর্ম বা বিশাল আকৃতির শিলাবৃষ্টির কারণে হয়তো তাঁরা মারা যান।
তবে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একদল মানুষ উনিশ শতকে কেন হিমালয়ের এই দুর্গম রূটের তীর্থক্ষেত্রে বা হ্রদের কাছে এসেছিলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল বা রেকর্ড এখনো পাওয়া যায়নি। তাঁরা কি কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, নাকি কোনো দীর্ঘ সমুদ্র ও স্থলপথের যাত্রা শেষে এখানে আটকা পড়েছিলেন—তা এখনো গবেষণার বিষয়।
২০১৯ সালের এই জিনগত গবেষণা রূপকুণ্ড হ্রদকে কেবল একটি মৃত্যুর স্থান হিসেবে নয়, বরং প্রাচীন আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক রহস্যময় কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছে। হিমালয়ের বরফ গলে আজও যখন নতুন নতুন কঙ্কাল বেরিয়ে আসে, তখন চূর্ণ হয়ে যায় ইতিহাসের পুরনো বহু তত্ত্ব। রূপকুণ্ডের এই কঙ্কাল হ্রদ আজও মানব ইতিহাসের এক অমিমাংসিত এবং রোমাঞ্চকর উপাখ্যান হিসেবে আমাদের টেনেই চলেছে।