স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে বড় বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার জাতির উদ্দেশে তাঁর ১৩তম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে উঠে এল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এবং ডেটা সেন্টারের প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী জানালেন, দেশে অন্তত ১ কোটি যুবক-যুবতীকে AI-ভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
লালকেল্লা থেকে মোদী বলেন, ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, চিপ এবং AI-এর গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। আর এই প্রযুক্তিগুলি চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। তাঁর কথায়, বিদ্যুৎ ছাড়া ভবিষ্যতের এই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব চালানো কঠিন হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিপ তৈরি থেকে শুরু করে AI এবং ডেটা সেন্টার—সব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন। তাই ভারতের জন্য শক্তি নিরাপত্তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে AI দক্ষতা বাড়ানোর উপরও জোর দেন মোদী। চলতি বছরের শুরুতে দিল্লিতে আয়োজিত AI Summit-এর প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, দেশের অন্তত ১ কোটি যুবককে AI স্কিলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
ভারতে দ্রুত বাড়ছে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মুম্বই, নভি মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, দিল্লি-NCR এবং জামনগরের মতো শহরে ডেটা সেন্টার তৈরি হয়েছে।
২০২০ সালে ভারতে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ইনস্টলড ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৭৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১,৫৭৫ মেগাওয়াট হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড় এবং পশ্চিমবঙ্গেও এই শিল্প আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ নিয়ে দেশের কিছু এলাকায় উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। মহারাষ্ট্রের থানে এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে ডেটা সেন্টার তৈরির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
থানেতে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি সংগঠন ‘Wake Up Thanekar’ অ্যামাজনের একটি বড় ডেটা সেন্টার প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। বলকম এবং মাজিওয়াড়ায় প্রায় ৫৩ থেকে ৫৮ একর জমিতে এই প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকার জল সরবরাহ এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। সেখানে আরও বড় ডেটা সেন্টার তৈরি হলে জল ও বিদ্যুতের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
বিশাখাপত্তনমেও একই ধরনের প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে। সেখানে একটি গুগল-আদানি হাইপারস্কেল AI ডেটা সেন্টার কমপ্লেক্স তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। পুরো প্রকল্পে প্রায় ১ গিগাওয়াট ক্ষমতার পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রকল্পের জন্য তিনটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। তারলুবাদা এলাকায় প্রায় ২০০ একর, আদাভিভারাম-মুদাসারলোভা এলাকায় প্রায় ১২০ একর এবং অনকাপল্লি জেলার রামবিল্লিতে প্রায় ১৬০ একর জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবাদকারীদের প্রধান উদ্বেগ জল ও বিদ্যুৎ নিয়ে। বিশাখাপত্তনমের বেশ কিছু এলাকায় ইতিমধ্যেই জল সরবরাহ নিয়ে সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে এত বড় ডেটা সেন্টার তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রস্তাবিত কয়েকটি জায়গা গুরুত্বপূর্ণ জলাধারের ক্যাচমেন্ট এলাকার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি কাম্বলাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের আশপাশের পরিবেশের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ, একদিকে AI এবং ডেটা সেন্টারকে ভবিষ্যতের ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরছে কেন্দ্র। অন্যদিকে, জল, বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ নিয়ে স্থানীয় স্তরে বাড়ছে উদ্বেগ। ফলে প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।