বড় বিপাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার সেনেট মার্কিন প্রশাসনের তহবিল সংক্রান্ত বিল অনুমোদন করতে ব্যর্থ হয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে বিল পাশ করা সম্ভব হয়নি। যার জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার ‘শাটডাউন’ হয়ে গিয়েছে। বুধবার ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ‘শাটডাউন’ শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।এর ফলে লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যাদের ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হবে।
ছ’ বছর আগেও মার্কিন মুলুকে একবার এই পরিস্থিতি হয়েছিল। তখনও প্রশাসনের গদিতে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেই সময়ে টানা একমাসের বেশি সময় ধরে অচলাবস্থা ছিল। ২০১৮ সালের শেষ দিকে শুরু হয়ে ২০১৯ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত টানা ৫ সপ্তাহ ওই অচলাবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময়কালের ‘শাটডাউন।’ ফের তাঁর সময়কালেই এই পরস্থিতি তৈরি হল সে দেশে।
ঘটনার সূত্রপাত
জানা গেছে, এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে মঙ্গলবারের এক বৈঠক। মঙ্গলবার বৈঠক বসেছিল, কারণ ১ অক্টোবর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় অর্থবর্ষ। গত অর্থবর্ষের শেষদিনে অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর নয়া অনুমোদন বিল প্রসঙ্গে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের তহবিল সংক্রান্ত বলে একমত হতে পারেনি কোনও শর্তেই। বরাদ্দ তহবিলের নয়া বিল রিপাবলিকানরা পাশ করাতে চাইলেও, তাতে ভোট মেলেনি ডেমোক্র্যাটদের। পর্যাপ্ত ভোটের অভাবে ওই বিল প্রেসিডেন্টের টেবিল পর্যন্তই পৌঁছতে পারেনি বলে জানা যাচ্ছে হোয়াইট হাউস সূত্রে। কারণ সেনেটে বিল পাশ করানোর জন্য ১০০ সদস্যের মধ্যে প্রয়োজন অন্তত ৬০ জনের ভোট। সেখানে রিপাবলিকানদের সদস্য সংখ্যা কেবল ৫৩। ফলে নয়া বিল পাশে ব্যর্থ হয় তারা। আর এই গোটা ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন আঙুল তুলেছে ডেমোক্র্যাটদের দিকেই। এটি গত দুই দশকের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চম বড় অচলাবস্থা হতে পারে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তহবিল সংক্রান্ত আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের দায়ারোপ করেছেন। তিনি হুমকি দিয়েছেন গণছাঁটাইয়ের। ট্রাম্প বলেন, ‘শাটডাউনের অনেক সুবিধা রয়েছে। আমরা যেগুলো চাই না, সেগুলো বাদ দিতে পারি। অনেককে ছাঁটাই করা হবে। তাঁরা প্রত্যেকে ডেমোক্র্যাট।’ ট্রাম্পের এই মন্তব্যই আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শাটডাউন কেবল সরকারি কাজে প্রভাব ফেলবে না, বরং রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়াবে।

শাটডাউনে প্রভাব
যেহেতু আর্থিক অভাবে এই শাটডাউন, সেক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের বহু কর্মীর বেতন বন্ধ থাকার সম্ভাবনা। কাজ হারাতেও পারেন বহু মানুষ। বন্ধ থাকার সম্ভাবনা একাধিক সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প। শিক্ষা বিভাগ এবং বেশ কয়েকটি সংস্থা প্রভাবিত হবে। শাটডাউন অবস্থা কাটা পর্যন্ত এমন ভাবেই চলতে পারে সরকার। কংগ্রেস (মার্কিন সেনেট) সময়মতো বাজেট পাস করতে না পারায় মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কাজ বন্ধ। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রায় ৭,৫০,০০০ সরকারি কর্মচারীর উপর, যারা ছুটিতে যেতে বাধ্য হবেন। অনেক সরকারি অফিস ও সংস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে, শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবাগুলি চলবে। এর পাশাপাশি বিমানবন্দর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।ছোট ব্যবসার জন্য ঋণ পরিষেবা বন্ধ হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। তবে মার্কিন সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী এবং এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারদের কাজ করে যেতে হবে। সরকারের ব্যয় কমাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিমান সংস্থাগুলি সতর্ক করে দিয়েছে যে শাটডাউনের কারণে সরাসরি বিমান চলাচলে বিলম্ব হতে পারে।
শাটডাউনের কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক ও দৈনন্দিন জীবনে বিপর্যস্ত হতে পারে। সরকারি সেবা বন্ধ থাকায় নাগরিকরা বেসরকারি ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হবেন। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিও প্রভাবিত হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শাটডাউন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। কতদিন চলবে শাটডাউন, তা নিয়েও এখনই নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
ইতিহাস বলছে, ১৯৮০ সালের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ বার সরকার অচল হল। এরমধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। সেই সময় এর প্রভাব পড়েছিল লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারীর উপর। কর্মীচারীদের অনেকে বেতন ছাড়াই সে সময় কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন, আবার অনেকে সাময়িক ছুটিতেও চলে গিয়েছিলেন। সরকারি সেবার সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার ও ব্যবসাগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এছাড়া পাসপোর্ট, ঋণ, অনুদান কিংবা জাতীয় উদ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েন।