তিন দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সহযোদ্ধা ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, রিজওয়ানুর থেকে শুরু করে সারদা, নারদা, নিয়োগ দুর্নীতি কিংবা এসআইআর— একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিনি দলের হয়ে আদালতে লড়েছেন। কিন্তু সেই কল্যাণ এবার দল ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিলেন। আজ সই জালিয়াতি মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে সওয়াল করা থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাকে ডাস্টবিন হিসাবে ট্রিট করো না, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আমাকে বলে দাও, আমি করব কি করব না! কিছুই জানায়নি। সন্ধ্যায় পড়ে আবার রেডি হলাম। রাত সাড়ে বারোটার সময়ে আমার ছেলেকে টেক্সট করে বলল, আমাকে থাকার দরকার নেই, অয়ন ভট্টাচার্য থাকবেন।’
ঘটনার সূত্রপাত একটি আইনি মামলাকে ঘিরে। কল্যাণের অভিযোগ, তাঁর বিষয়ভুক্ত ফৌজদারি মামলায় তাঁকে না জানিয়েই অন্য আইনজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বুধবার তাঁর চেম্বারে একজন এসে জানান যে একটি রিট পিটিশন দায়ের হয়েছে, অথচ তাঁকে আগে কিছুই জানানো হয়নি। পরে জানতে পারেন, মামলাটি অন্য আইনজীবী দেখছেন। সেখান থেকেই ক্ষোভের সূত্রপাত।
কল্যাণের দাবি, সই জালিয়াতি মামলায় তিনি আদালতে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন করেছিলেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের দফতরে সিআইডির তল্লাশির বিষয়টিও বিচারপতির নজরে এনেছিলেন। কিন্তু সেই মামলায় শেষ মুহূর্তে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য আসে অভিষেককে নিয়ে। কল্যাণ বলেন, আমি ৪৫ বছর ধরে প্র্যাকটিস করছি। একজন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেটাও জানে না। এত ঔদ্ধত্যের কী আছে?’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘ওর জন্য দলটার সর্বনাশ হয়েছে। এখনও যদি সেটা না বোঝে, তাহলে কিছু করার নেই।’
এরপরই তিনি কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে শর্ত রেখে দেন। তাঁর বক্তব্য, ‘দিদি অভিষেককে নিয়ে চললে চলুক, আমাকে দরকার নেই। আর অভিষেককে বাদ দিয়ে যদি দিদি চলে, আমি আছি।’ কল্যাণ আরও দাবি করেন, অভিষেকের আচরণ ও রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘ওর জন্য আমাদের চোর-চোর শুনতে হচ্ছে। ওর জন্য জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আমার।’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের ভাঙন, সাংসদদের বিদ্রোহ, নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এবং সই জালিয়াতি মামলার চাপের মধ্যেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ দলীয় অন্দরের গভীর সংকটকে সামনে এনে দিল। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সৈনিকের মুখে এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।