ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে বড় পতন ঘটেছে। যুদ্ধ চলাকালীন যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২৬ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৩ ডলার প্রতি ব্যারেলে। বিশ্ববাজারে তেলের এই বড় মূল্যপতনের পর বিশ্বের বহু দেশ পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমিয়েছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এখনও জ্বালানির খুচরো দামে কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও ভারতে কেন সেই সুবিধা মিলছে না?
তথ্য অনুযায়ী, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম প্রায় ১০২.১২ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯৫.২০ টাকার আশেপাশে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই দামে কোনও পরিবর্তন হয়নি। অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির অধিকাংশই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সুবিধা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ভুটানে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে প্রায় ১০৯.৭৩ টাকা থেকে কমে ৯৯.৯৪ টাকায় নেমেছে। পাকিস্তানেও পেট্রোলের গড় দাম ১৩০.৮২ টাকা থেকে কমে প্রায় ১০১.৯১ টাকায় এসেছে। ফলে বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটানের পর পাকিস্তানেই সবচেয়ে সস্তায় পেট্রোল মিলছে। একইভাবে বাংলাদেশে পেট্রোলের দাম ১১২.৬৮ টাকা থেকে কমে ১১১.৭১ টাকা হয়েছে। মায়ানমারে ১৪০.২০ টাকা থেকে কমে ১১৬.০৯ টাকা, চিনে ১৩২.৮১ টাকা থেকে কমে ১১৯.০৯ টাকা, নেপালে ১৩৬.৪১ টাকা থেকে ১৩৫.৫৭ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৪২ টাকা থেকে কমে ১৪০.১২ টাকা হয়েছে।
ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানে ডিজেলের দাম ১৩৯.০৭ টাকা থেকে কমে ১০৫.৯৮ টাকায় নেমেছে। বাংলাদেশে ৯০.১০ টাকা থেকে কমে ৮৮.৬০ টাকা, চীনে ১১৯.৯২ টাকা থেকে ১০৬.২০ টাকা, মিয়ানমারে ১৪০.১৩ টাকা থেকে ১১৮.৫৮ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৩৭.১২ টাকা থেকে ১৩৫.৩১ টাকা এবং নেপালে ১৪১.৩৪ টাকা থেকে ১৪০.৫৭ টাকায় এসেছে। তুলনায় ভারতে ডিজেলের গড় দাম এখনও প্রায় ৯৮.১০ টাকা প্রতি লিটার।
তাহলে ভারতে দাম কমছে না কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক অর্থনৈতিক কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যখন দ্রুত বাড়ছিল, তখন ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে পেট্রোল-ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে নির্বাচন চলাকালীন প্রায় আড়াই মাস জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। পরে মে মাসে চার দফায় প্রতি লিটারে মোট ৭.৫০ টাকা করে দাম বৃদ্ধি করা হয়। আন্তর্জাতিক তুলনায় এই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

এছাড়া কেন্দ্র সরকার সেই সময় পেট্রোল ও ডিজেলের উপর প্রতি লিটারে ১০ টাকা করে আবগারি শুল্ক (এক্সাইজ ডিউটি) কমিয়েছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধাক্কা লাগে। অনুমান করা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্তের কারণে বছরে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলিও দীর্ঘদিন বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্যবৃদ্ধি না করায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতে, এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। বর্তমান পর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। সেই কারণেই এখনই পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমানোর সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে পেট্রোল-ডিজেলের খুচরো দাম শুধু আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের মূল্যের উপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কেন্দ্র ও রাজ্যের কর, পরিবহণ ব্যয়, বিপণন খরচ, মুদ্রার বিনিময় হার এবং তেল সংস্থাগুলির আর্থিক অবস্থাও। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও তার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে দেশের খুচরো বাজারে পড়ে না।