ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী সংগঠনের শীর্ষ নেতা মিসির বেসরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর এবার পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা সীমান্তে সক্রিয় মাওবাদী স্কোয়াডগুলিকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার লক্ষ্যে বড়সড় যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করেছে তিন রাজ্যের পুলিশ। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, বাংলার মাওবাদী নেতা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ ওরফে তিমির ওরফে মনোজের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র স্কোয়াড বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামের পাহাড়ি জঙ্গল এলাকায় ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করছে। তাঁদের ধরতেই এবার ‘সারান্ডা মডেল’-এ ঘেরাও করে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর জঙ্গলমহলে মাওবাদী কার্যকলাপ কার্যত স্তিমিত হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর প্রায় ১৪ বছর পর অসীম মণ্ডলের স্কোয়াড দলমা পাহাড় সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় ফের সক্রিয় হয়েছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য এসেছে। ওই স্কোয়াডের সদস্যদের মধ্যে অসীম মণ্ডলের মাথার দাম একসময় এক কোটি টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল।
মিসির বেসরাকে গ্রেপ্তারের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিন রাজ্যের পুলিশ আধিকারিকদের একটি উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই মাওবাদীদের বিরুদ্ধে আগামী অভিযানের রূপরেখা তৈরি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী একযোগে অভিযান চালাবে, যাতে এক রাজ্যে চাপ সৃষ্টি হলে মাওবাদীরা অন্য রাজ্যের সীমানায় পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করতে না পারে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়খণ্ডের কোলহান রেঞ্জের ডিআইজি অনুরঞ্জন কিসপট্টা, ওড়িশার পশ্চিমাঞ্চলের ডিআইজি ব্রজেশ কুমার রাই, পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া রেঞ্জের ডিআইজি অভিষেক মোদি, পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামের পুলিশ সুপার-সহ তিন রাজ্যের একাধিক জেলার শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকরা। এছাড়াও ঝাড়খণ্ডের পূর্ব ও পশ্চিম সিংভূম, সরাইকেলা-খরসোয়াঁ, জামশেদপুর এবং ওড়িশার কেওনঝড়, রাউরকেলা, সুন্দরগড় ও ময়ূরভঞ্জ জেলার পুলিশ সুপাররাও এই বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি যৌথ অভিযান পরিচালনার কৌশল নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের লক্ষ্য অনুযায়ী দেশকে মাওবাদমুক্ত করার অভিযানে গত কয়েক বছরে ছত্তীসগঢ়, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বহু শীর্ষ মাওবাদী নেতা নিহত হয়েছেন বা আত্মসমর্পণ করেছেন। সম্প্রতি মিসির বেসরার গ্রেপ্তারকে সেই অভিযানের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, তাঁর গ্রেপ্তারের পর সংগঠনের মনোবল অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যেই একাধিক মাওবাদী অস্ত্র-সহ আত্মসমর্পণ করেছেন।

গোয়েন্দাদের দাবি, সারান্ডা জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর চাপ বাড়ার পর চলতি বছরের মে মাস থেকেই মাওবাদী নেতৃত্ব বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সেই সময় অসীম মণ্ডলের স্কোয়াডও নতুন করে পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। তবে এবার সারান্ডা অভিযানের কৌশল অনুসরণ করেই তিন রাজ্যের যৌথ বাহিনী জঙ্গলমহল সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘেরাও করে অভিযান চালাবে। নিরাপত্তা বাহিনীর আশা, এই অভিযানে সফল হলে পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে মাওবাদী সশস্ত্র কার্যকলাপের অবশিষ্ট নেটওয়ার্কও সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে।