আমরা নাকি মোটে ‘৮০ শতাংশ’ মানুষ! বাকি ২০ শতাংশ জুড়ে কারা?

Spread the love

বিবর্তনীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে মানুষের উৎপত্তির কাহিনী প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে। আইএফএল সায়েন্স (IFL Science)-এ প্রকাশিত একটি অতি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা কেবল নিয়ানডার্থাল বা ডেনিসোভানদের সাথেই নয়, বরং সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ‘সুপার-আর্কাইক’ (Super-archaic) বা অতি-প্রাচীন মানব প্রজাতির সাথেও মিলিত হয়েছিল। এই আবিষ্কারটি মানুষের ডিএনএ-র এক রহস্যময় অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে।

আমরা দীর্ঘকাল ধরে জানতাম যে আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্স যখন আফ্রিকা থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তারা নিয়ানডার্থালদের সংস্পর্শে এসেছিল। কিন্তু আধুনিক মানুষের জিনোম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন এক অভূতপূর্ব তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তে এমন দুটি প্রজাতির চিহ্ন রয়েছে যারা নিয়ানডার্থালদের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন এবং যাদের সম্পর্কে এতদিন বিজ্ঞানের কাছে কোনো তথ্য ছিল না।

কারা এই ‘সুপার-আর্কাইক’ প্রজাতি?

গবেষকদের মতে, এই অতি-প্রাচীন প্রজাতিগুলো প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে মানুষের বিবর্তনীয় শাখা থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এরা ছিল মূলত এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা নিয়ানডার্থাল এবং ডেনিসোভানদেরও পূর্বপুরুষ হতে পারে। যখন আমাদের আরও আধুনিক পূর্বপুরুষেরা ইউরেশিয়ায় প্রবেশ করে, তখন তারা এই আদিমতম প্রজাতির সাথে মিলিত হয় এবং তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য আমাদের ডিএনএ-তে স্থায়ীভাবে থেকে যায়।

ডিএনএ-র ‘ভূতুড়ে’ সংকেত (Ghost DNA)

বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অত্যাধুনিক জেনেটিক ম্যাপিং ব্যবহার করে এই আবিষ্কারটি করেছেন। মানুষের জিনোমে এমন কিছু অংশ পাওয়া গেছে যা পরিচিত কোনো প্রজাতির সাথে মেলে না। একে বিজ্ঞানীরা ‘গোস্ট ডিএনএ’ বা ভুতুড়ে ডিএনএ বলছেন। এই সংকেতগুলো প্রমাণ করে যে অন্তত দুবার আলাদা আলাদা সময়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই অতি-প্রাচীন প্রজাতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। একবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং সম্ভবত অন্য আরেকবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশে।

কেন এই আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ?

১. জটিল বিবর্তনীয় ইতিহাস: এটি প্রমাণ করে যে মানুষের বিবর্তন কোনো সরল রেখা নয়, বরং এটি একটি বিশাল জালের মতো যেখানে বিভিন্ন প্রজাতি একে অপরের সাথে মিশে গেছে।

২. টিকে থাকার রহস্য: এই অতি-প্রাচীন প্রজাতির কাছ থেকে পাওয়া কিছু জিন হয়তো আধুনিক মানুষকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

৩. অজানা প্রজাতির অস্তিত্ব: এটি নির্দেশ করে যে পৃথিবীতে এমন অনেক মানব প্রজাতি ছিল যাদের কোনো জীবাশ্ম আজও আমরা খুঁজে পাইনি, কিন্তু তারা আমাদের অস্তিত্বের মধ্যেই বেঁচে আছে।

বিবর্তনের নতুন মানচিত্র

এই গবেষণার ফলে মানুষের অভিবাসনের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হচ্ছে। আফ্রিকা থেকে বেরোনোর পর আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেবল নতুন ভূখণ্ডই জয় করেনি, বরং সেখানে আগে থেকে থাকা আদিমতম মানুষদের সাথেও একাত্ম হয়েছিল। এই ‘সুপার-আর্কাইক’ মানুষদের সাথে আমাদের এই মিলনই আজকের বৈচিত্র্যময় মানবজাতির ভিত্তি তৈরি করেছে।

আমরা আসলে কারা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে আমরা একাই বিবর্তিত হইনি। আমাদের রক্তে বয়ে চলেছে এমন সব প্রজাতির ধারা যারা লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে বলে আমরা ভাবতাম। এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের অন্যতম জটিল ও রোমাঞ্চকর এক ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *