ইরানের তেল ‘দখল’ করতে চান ট্রাম্প, পারবেন?

Spread the love

তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ যখন দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে, সেই সময়েই ইরানের ‘তেল দখল’ করতে চান বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? আর কী হতে পারে এর পরিণতি?শুধু তেল দখলই নয়, ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে তেহরান যদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দেয়, তাহলে তিনি ইরানের তেল কূপসহ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবেন। এই প্রণালীটি কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের কার্যত অবরোধের অধীনে রয়েছে, যা একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশ এবং বহু দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের স্পষ্ট কোনো লক্ষ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেনি ট্রাম্প প্রশাসন।

নিচে ট্রাম্প কী বলেছেন, ইরানের তেলের পরিমাণ কত এবং যুক্তরাষ্ট্র তা দখল করতে পারবে কি না- তা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

ইরানের তেল নিয়ে কী বলেছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্প ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ইরানের তেল দখল করাই তার অগ্রাধিকার হবে এবং মার্কিন বাহিনী খারগ দ্বীপে অবস্থিত ইরানের রফতানি কেন্দ্রটি (তেল) দখল করতে পারে।

খারগ দ্বীপটি ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি প্রবাল দ্বীপ। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থাকা এই দ্বীপে প্রবেশ করতে সরকারি নিরাপত্তা অনুমতি প্রয়োজন হয়।

ইরানের মোট তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিচালনা করা হয়।

গত ১৪ মার্চ ট্রাম্প ঘোষণা করেন, মার্কিন বিমান বাহিনী দ্বীপটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, 

ভদ্রতার খাতিরে, আমি দ্বীপটির তেল পরিকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে, ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার জন্য কিছু করে, তাহলে আমি অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।

সমালোচকরা বলছেন, জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে অপহরণের মাধ্যমে চালানো অভিযানে সফল হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন আরও সাহসী হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, তারা এখন ভেনেজুয়েলার তেল রফতানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ট্রাম্প পরে দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনের রিফাইনারিতে আনা হয়েছে এবং আরও ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল পথে রয়েছে। 

বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুদের অধিকারী ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ তেল খাত জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকেই খারাপ হতে থাকে। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের উত্তরসূরি মাদুরোর অধীনে এই সম্পর্ক আরও ভেঙে পড়ে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ পরে এই খাত বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করেন। 

ইরানের কাছে কত তেল আছে?

ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যানুসারে, দেশটির কাছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের মোট তেল মজুদের প্রায় ২৪ শতাংশ এবং বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ তেল ইরানের দখলে, যার পরিমাণ প্রায় ১৫৭ বিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্বে ইরান নবম বৃহত্তম তেল উৎপাদক এবং ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ, যারা প্রতিদিন প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে।

যুদ্ধের আগে ইরান প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি করত। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় স্বাক্ষরিত ‘জেসিপিওএ’ চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের তেল দখল করতে পারবে?

মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, পেন্টাগন ইরানে সীমিত স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে খারগ দ্বীপ এবং হরমুজ প্রণালীর নিকটবর্তী উপকূলীয় স্থানগুলোতে সম্ভাব্য অভিযানও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

প্রতিবেদন অনুসারে, পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের বদলে এসব পরিকল্পনায় বিশেষ বাহিনী ও সাধারণ পদাতিক বাহিনীর মাধ্যমে অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *