রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আবহে ফের সামনে এল খাদ্যাভ্যাস ও ব্যবসা ঘিরে বিতর্ক। ব্রিগেডে গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে চিকেন প্যাটিস বিক্রি নিয়ে যে বিতর্ক এক সময় রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিল, সেই স্মৃতিই যেন আবার ফিরে এল। এবার অভিযোগের কেন্দ্র হাওড়ার ডোমজুড়। এক মুরগির মাংস বিক্রেতাকে হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে ওই ব্যবসায়ীকে রোহিঙ্গা এবং জেহাদি বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, দোকান তুলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। আর এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডোমজুড় বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী গোবিন্দ হাজরা। ঘটনায় স্বভাবতই সুর চড়িয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। ঘটনাকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এলাকায়।
ডোমজুড় বিধানসভা এলাকার জগদীশপুর মোড়ের কাছে প্রায় বছর দেড়েক ধরে ফুটপাতে মুরগির মাংস বিক্রি করেন টুটুল হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী। তাঁর দাবি, তিনি বীরভূমের লাভপুরের বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত ভোটার। সম্প্রতি প্রকাশিত এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগ, প্রচারে বেরিয়ে ডোমজুড়ের বিজেপি প্রার্থী গোবিন্দ হাজরা তাঁর দলীয় সমর্থকদের নিয়ে এলাকায় ঘোরার সময় এক মাংস বিক্রেতার দোকানের সামনে দাঁড়ান। সেখানেই ওই ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা, জেহাদি বলে কটূক্তি করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ ঘটনাটি ঘটে। অভিযোগ, দলীয় পতাকা হাতে কয়েকজনকে নিয়ে ওই প্রার্থী আচমকা ব্যবসায়ীর দিকে এগিয়ে যান এবং তাঁকে নানা ভাবে হেনস্থা করতে শুরু করেন। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ভিডিওতেই টুটুল হোসেনকে লক্ষ্য করে একেবারে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে গোবিন্দ বলেন, ‘তুমি এখানকার বাসিন্দা নও। তুমি রোহিঙ্গা, তুমি জেহাদি, তুমি বাংলাদেশি।’ যদিও ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেনি ইনিউজ বাংলা।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে শেষ পর্যন্ত টুটুল হোসেনকে দোকান খুলে ফেলতেও বাধ্য করা হয়। পরে তিনি ক্যামেরার সামনেও একই অভিযোগ করেন। অভিযোগ, দোকানটি রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দেড় বছর ধরে ওই ব্যবসায়ী এলাকায় কোনও সমস্যা ছাড়াই ব্যবসা চালাচ্ছিলেন। আগে কখনও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে। এই ঘটনায় স্বভাবতই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন টুটুল। ওই ব্যবসায়ীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাড়ি বীরভূম জেলার লাভপুরে। সেখানে তাঁর পরিবারের সকলের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিও তাঁর কাছে আছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবুও কেন তাঁকে এইভাবে হেনস্থা করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় মহলে। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র হয়েছে। এ খবর প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদায়ী মন্ত্রী তথা হাওড়া সদর তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান অরূপ রায়। বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু মুসলিমরা তাদের ভোট দেন না তাই যাকে তাকে তারা রোহিঙ্গা তকমা দিচ্ছে। এসব বাংলার মানুষ মেনে নেবে না।’ অন্যদিকে, অভিযুক্ত প্রার্থীর বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর দাবি, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর বাড়ির সামনে ওই ব্যবসায়ীকে বসানো হয়েছে, যাতে তিনি যাতায়াতে সমস্যায় পড়েন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি লোকজনকে রাজ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা চলছে। যদিও তিনি এ-ও বলেন, যদি তাঁর বক্তব্যে কোনও ভুল থাকে, তবে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডোমজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। নির্বাচনের মুখে এই বিতর্ক যে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। সব মিলিয়ে, ভোটের মুখে এই ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। খাদ্যাভ্যাস, পরিচয় – এই দুই বিষয়কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য হয়ে উঠেছে।
