ভারতের সামুদ্রিক সুরক্ষায় সূচনা হল এক নতুন অধ্যায়ের। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, একই দিনে নৌসেনার অস্ত্রাগারে যুক্ত হতে চলেছে তিন ভিন্ন শ্রেণির অত্যাধুনিক রণতরী। যার মধ্যে দু’টির নির্মাতা এ রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা গার্ডেনরিচ শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)। সূত্রের খবর, শত্রুপক্ষের নজরদারি এড়াতে সক্ষম ‘স্টেলথ ফ্রিগেট’ আইএনএস দুনাগারি, অগভীর জলে চলাচল করতে সক্ষম ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী রণতরী আইএনএস অগ্রয় এবং সমুদ্র গবেষণা ও নজরদারি জাহাজ আইএনএস সংশোধক-কে শীঘ্রই কমিশন করা হবে। আর তার ফলে ভারত মহাসাগর এবং সংলগ্ন অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত আধিপত্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (জিআরএসই) তরফে ইতিমধ্যে আইএনএস দুনাগারি, আইএনএস অগ্রয় এবং আইএনএস সংশোধক-কে তুলে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় নৌসেনার হাতে।
১. দুনাগিরি
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, ‘আইএনএস দুনাগিরি’ নীলগিরি গোত্রের পঞ্চম ফ্রিগেট। ‘প্রকল্প ১৭ আলফা ফ্রিগেট’-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট রণতরীটি নির্মাণ প্রক্রিয়া রেকর্ড ৮০ মাস সময়ে শেষ করা হয়েছে। ১৪৯ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং ৬,৬৭০ টন ওজনের ওই যুদ্ধজাহাজের অস্ত্রসম্ভারের মধ্যে রয়েছে, ভারত-রুশ যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র। ৭৫ শতাংশ দেশীয় উপাদান এবং ২০০-রও বেশি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অবদানে নির্মিত এই ফ্রিগেটটি প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ‘আত্মনির্ভরতা’র অন্যতম উদাহরণ। সর্বোচ্চ ২৮ নটিক্যাল মাইল (অর্থাৎ ঘণ্টায় ৫২ কিলোমিটার) বেগে ছুটতে পারে এই যুদ্ধজাহাজ। স্টেলথ প্রযুক্তির সাহায্যে ‘আড়ালে থেকে’ সমুদ্রের বুকে ৫,৫০০ নটিক্যাল মাইল জুড়ে চালাতে পারে নজরদারি। এতে ২২৫ জন নৌসেনার থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
২. অগ্রয়
আইএনএস অগ্রয় হল অর্নালা শ্রেণির চতুর্থ ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী রণতরী। ৭৭ মিটার দৈর্ঘ্যের এই জাহাজটি ওয়াটারজেট দ্বারা চালিত। হালকা টর্পেডো, দেশীয় রকেট লঞ্চার এবং অগভীর জলের কর্মক্ষম সোনার (শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ সন্ধানী যন্ত্র) দিয়ে সজ্জিত। ৮০ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান তৈরি এই যুদ্ধজাহাজ উপকূলীয় নজরদারি এবং মাইন চিহ্নিতকরণেও দক্ষ। সমুদ্রের অগভীর জলে শত্রুপক্ষের সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ শনাক্ত করতে এবং সেগুলিকে ধ্বংস করতে ‘অগ্রে’ জাহাজটি অত্যন্ত কার্যকর। অগভীর জলে যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

৩. সংশোধক
তৃতীয় জাহাজ আইএনএস সংশোধক হাইড্রোগ্রাফিক এবং সমুদ্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত মিশনের জন্য নকশা করা হয়েছে। ১১০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩,৪০০ টন ওজনের এই জাহাজে নজরদারির জন্যেও উন্নত সরঞ্জাম রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম, সমুদ্রের গভীরে চলাচলে সক্ষম ‘অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকলস’ , দূরনিয়ন্ত্রিত যান ‘রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকলস’ এবং নজরদারি যন্ত্র ‘ডিজিটাল সাইড-স্ক্যান সোনার’। তবে কেবল সমীক্ষা নয়, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এটি একটি ভাসমান হাসপাতাল হিসেবে কাজ করতে পারে এবং হেলিকপ্টার অপারেশনে সহায়তা দিতে সক্ষম। গভীর সমুদ্রে তথ্য সংগ্রহ এবং কৌশলগত অবস্থানে নজরদারি চালানোর জন্য এটি ভারতের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রের খবর, একই সঙ্গে চিন এবং পাকিস্তানের হামলা মোকাবিলার লক্ষ্যে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতীয় নৌসেনার হাতে যাতে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন থাকে, সে বিষয়ে সক্রিয় হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রে প্রায় ৬০টি যুদ্ধজাহাজের নির্মাণকাজ চলছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর নৌবাহিনীতে ১২টি রণতরী যুক্ত করা হয়েছিল এবং আশা করা হচ্ছে যে, ২০২৬ সালে এই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যাবে। এই নতুন জাহাজগুলোর অন্তর্ভুক্তি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন নৌবাহিনীর নেতৃত্বেও পরিবর্তন হচ্ছে; ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথনকে ভারতীয় নৌবাহিনীর পরবর্তী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ভারত সরকার। তিনি বর্তমান নৌবাহিনী প্রধানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ৩১ মে থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পদে থাকবেন। বর্তমানে তিনি মুম্বইয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় নৌ কম্যান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কম্যান্ডিং-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এমন এক সন্ধিক্ষণে দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন ভারত ‘প্রজেক্ট ৭৫আই’-এর আওতায় অভ্যন্তরীণভাবে ছয়টি পরবর্তী প্রজন্মের প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণের জন্য ৭০,০০০ কোটি টাকার একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সেই আবহেই বাংলার মাটিতে তৈরি এই রণতরীগুলি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে নীল জলরাশির অতন্দ্র প্রহরী হতে চলেছে।