পদ্মশ্রী পেলেও ব্রাত্যই রয়ে গেলেন? চার দশকের কেরিয়ারে কোন সম্মান অধরা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের?

Spread the love

তিনি টলিউডের ‘ওয়ান অ্যান্ড অনলি’ বুম্বাদা। গত চার দশক ধরে যিনি একা কাঁধে টেনে নিয়ে চলেছেন টলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে। আটের দশকে ‘অমর সঙ্গী’র চকোলেট বয় ও রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে যে সফরের শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সাথে সাথে বাঁক নিয়েছে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’, ‘দোসর’ কিংবা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘অটোগ্রাফ’, ‘জাতিস্মর’-এর মতো সমান্তরাল ধারার ছবিতে। নিজেকে বারবার ভেঙেছেন আর গড়েছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ভারত সরকার তাঁকে সিনেমা জগতে অবদানের জন্য চলতিবার ‘পদ্মশ্রী’ (Padma Shri) খেতাবেও ভূষিত করেছে।

সোমবার রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সেই সম্মান গ্রহণ করলেন বুম্বাদা। গর্বে বুক ফুলল গোটা বাংলার। নিঃসন্দেহে কিন্তু বাংলা তথা বাঙালির গর্ব। কিন্তু দীর্ঘ ৪০ বছরের এই রূপোলি সফরের শেষে এসেও একটা বড় আক্ষেপ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না বাংলার এই পয়লা নম্বর নায়কের। চার দশক পার করে ফেললেও প্রসেনজিতের আলমারিতে আজও অধরা থেকে গেল ভারতের ‘সেরা অভিনেতা’র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award for Best Actor)!

জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চ যে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে একেবারে খালি হাতে ফিরিয়েছে, তা কিন্তু নয়। ২০০৬ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দোসর’ ছবিতে এক পরকীয়া ও দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া যুবকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সিনেমাহল। সেই বছর জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে সেরা অভিনেতার দৌড়ে বেশ জোরালো নাম ছিল তাঁর। কিন্তু শেষমেশ প্রধান পুরস্কার অধরাই থেকে যায়, তাঁর ভাগ্যে জোটে কেবল ‘স্পেশ্যাল জুরি মেনশন’ (Special Jury Mention)। যা আদতে একটা বড় প্রাপ্তি হলেও, ‘সেরা অভিনেতা’র শিরোপা না পাওয়ার আক্ষেপকে ঢাকতে পারেনি।

‘চোখের বালি’ থেকে ‘জাতিস্মর’: বারবার ব্রাত্য বুম্বাদা!

সিনেমাপ্রেমীদের একাংশের মতে, জাতীয় পুরস্কারের জুরিরা বারবারই প্রসেনজিতের প্রতি এক অলিখিত পক্ষপাতিত্ব বা অবহেলা দেখিয়েছেন। ‘চোখের বালি’র মহিন্দ্র হোক, কিংবা ‘অটোগ্রাফ’-এর অরুণ চ্যাটার্জি— বুম্বাদার অভিনয় টেক্কা দিতে পারত ভারতের যেকোনো প্রথম সারির অভিনেতাকে। বিশেষ করে ‘জাতিস্মর’ ছবিতে প্রসেনজিতের অনবদ্য অভিনয় দেখে খোদ সমালোচকেরাও ভেবেছিলেন, এবার হয়তো জাতীয় পুরস্কারের খরা কাটবে বাংলার। কিংবা লালন ফকির রূপে দর্শকদের মনে মুগ্ধতা ছড়ানো প্রসেনজিৎ নিশ্চিতভাবে জাতীয় পুরস্কার পাবেন, আশা ছিল এমনটাও। তবে তা সফল হয়নি। সেবারও ব্রাত্যই থেকে যেতে হলো তাঁকে। অথচ তাঁর সমসাময়িক কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই এই সম্মান ঘরে তুলেছেন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের হাঁটুর বয়সী ঋদ্ধি সেনও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে সেরা অভিনেতার সম্মান পেয়েছেন।

জনপ্রিয়তা বনাম পুরস্কারের লড়াই:

অবশ্য পুরস্কার দিয়ে কি আর কোনও শিল্পীর ক্যালিবার মাপা যায়? প্রসেনজিৎ নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দর্শকদের ভালোবাসাই তাঁর কাছে শেষ কথা। যে মানুষটা সিনেমাকে ভালোবেসে নিজের জীবনের চল্লিশটা বছর স্টুডিওর ফ্লোরে কাটিয়ে দিলেন, তাঁর কাছে একটা ট্রফি হয়তো কেবলই একটা সংখ্যা।

তবুও বাঙালির আবেগ বলে কথা! টলিপাড়ার অন্দরে কান পাতলে এখনও একটা ফিসফাস শোনা যায়— বলিউড বা দক্ষিণী ছবির নায়কদের যেভাবে জাতীয় মঞ্চে কদর দেওয়া হয়, প্রসেনজিতের মতো একজন লিভিং লেজেন্ড কি তবে বাঙালি বলেই চার দশকেও ব্রাত্য রয়ে গেলেন? পদ্মশ্রী দিয়ে হয়তো রাষ্ট্র তাঁর আজীবনের প্রতিভাকে কুর্ণিশ জানিয়েছে, কিন্তু ‘জাতীয় সেরা অভিনেতা’র তকমাটা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নামের পাশে না বসাটা যে বাংলা সিনেমার ইতিহাসেও একটা বড় খামতি হয়েই থেকে যাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এই খরা কাটবে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে উঠবে এই সম্মান, এমনটাই আশা তাঁর লাখো ভক্তের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *