অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ ও ভূমি দখল প্রকল্পের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস।
গোষ্ঠীটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাভি বলেছেন, পশ্চিম তীরের বাসিন্দাদের, বিশেষ করে জেনিন গভর্নরেটের মানুষকে এমন সব প্রকল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, যেগুলো বড় পরিসরে ভূমি দখল এবং কৌশলগত এলাকা নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিম তীরের জেনিনের দক্ষিণে অবস্থিত সিলাত আদ-ধাহর এলাকায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি এবং অর্থনৈতিক স্থাপনার ওপর দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জমি বাজেয়াপ্তকরণ, ভবন ধ্বংসের নির্দেশ এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া।
আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) হামাসের টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত বক্তব্যে মারদাভি বলেন, এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর প্রতিরোধ’ গড়ে তোলা জরুরি, যাতে ফিলিস্তিনি উপস্থিতির ওপর চলমান চাপকে প্রতিহত করা যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রকল্প ও পরিকল্পনার বিরুদ্ধে নীরব থাকা ভবিষ্যতে স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি পশ্চিম তীরের জনগণের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন, উল্লেখ করে বলেন তারা দীর্ঘদিন ধরে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে আসছে এবং নিজেদের ভূমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।
এদিকে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করা যাবে না। তার ভাষায়, সেখানে এমন কোনো প্রচেষ্টাই বাদ রাখা হচ্ছে না যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।
ল্যাভরভ আরও বলেন, ‘আমাদের পশ্চিম তীরের ঘটনাগুলো ভুলে গেলে চলবে না, যেখানে নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে যেন সেখানে কখনো কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হয়।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নের ন্যায্য সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে বলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ রুদ্ধ থাকলে অঞ্চলটি বহু বছর ধরে অস্থিতিশীলতা ও চরমপন্থার ঝুঁকিতে থাকবে।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় গত প্রায় তিন বছর ধরে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরাইল। এতে ভূমধ্যসাগরের তীরের এক চিলতে ভূখণ্ড কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এদিকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চলতি মাসে ইসরাইল হেবরনের কেন্দ্রে একটি ইহুদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে।

ইসরাইলের কট্টর ইহুদি ধর্মীয় নেতা ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এটাকে ‘মাঠের বাস্তবতা সৃষ্টি’ এবং ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ জোরদারের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, আরব দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে পশ্চিম তীরে প্রশাসনিক ও ভূমি-সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা কার্যত সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপ দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক পরিবর্তন এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক চাপ ও বিতর্ক তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।