CM Suvendu Adhikari: ‘পাহাড় তথা উত্তরবঙ্গই প্রথম বিজেপিকে জায়গা করে দিয়েছে। বাংলাকে বাঁচানোর জন্য আপনাদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা উত্তরবঙ্গের সেই ঋণ শোধ করব।’ বাগডোগরা বিমানবন্দরে পা রেখেই উত্তরবঙ্গবাসীর উদ্দেশ্যে এমনই বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উত্তরবঙ্গে পা রাখতেই তাঁকে স্বাগত জানাতে বুধবার বিমানবন্দর চত্বরে কর্মী-সমর্থকদের পক্ষ থেকে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, সাংসদ রাজু বিস্তা।
রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে উত্তরবঙ্গের মাটিতে এটাই প্রথম শুভেন্দু অধিকারীর হাইপ্রোফাইল প্রশাসনিক বৈঠক। আর সেই বৈঠককে ঘিরেই সেজে উঠেছে ‘উত্তরকন্যা।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অলিন্দে ছিল টানটান উত্তেজনা। এদিন শিলিগুড়ি পৌঁছে উত্তরবঙ্গের মানুষকে প্রণাম করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উত্তরবঙ্গে বিজেপিকে জেতানোর জন্য সাধারণ মানুষদের শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সংকল্পপত্রে থাকা সমস্ত প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করা হবে। উত্তরবঙ্গের মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছেন, বিজেপি তা বাস্তবায়িত করবে। দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থাকা এই অঞ্চলের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ এবার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করবে নতুন সরকার।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে এদিন এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করা হয়েছে। এবার থেকে প্রত্যেক মাসে রাজ্য মন্ত্রীসভা উত্তরবঙ্গের মানুষের দুয়ারে পৌঁছে যাবে। প্রতি মাসে এবার থেকে উত্তরবঙ্গে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যাবেন। উন্নয়নের কাজও খতিয়ে দেখবেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক প্রত্যেক সপ্তাহে অন্তত একদিন উত্তরকন্যায় বসে দফতরের কাজ পরিচালনা করবেন বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে উন্নয়নের কাজকর্ম দেখাশোনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গেও দেখা করে তাঁদের দাবিদাওয়া-কথা শুনবেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী। এদিন একপাশে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং অন্যপাশে নবনিযুক্ত উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে সঙ্গে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন শুভেন্দু অধিকারী। অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষ দু’হাত উজাড় করে বিজেপির পাশে থেকেছেন। তাই এবার আমাদের ঋণ শোধ করার পালা। সরকারে আসার পর ভোটের আগে দেওয়া আমাদের সমস্ত প্রতিশ্রুতি আমরা পূরণ করবই।’ একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘এবার থেকে প্রতি মাসে আমি এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা উত্তরবঙ্গে আসবেন। তবে আমরা এখানে কোনও পাহাড়ি হাওয়া খেতে বা ঘুরতে আসব না, স্রেফ কাজ করতে আসব। আর প্রতি সপ্তাহে আমাদের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উত্তরকন্যায় বসবেন।’

মুখ্যমন্ত্রী ও উত্তরকন্যায় বৈঠক
বিমানবন্দর থেকে সোজা শিলিগুড়ির স্যাটেলাইট টাউনশিপে অবস্থিত রাজ্য সরকারের মিনি সচিবালয় ‘উত্তরকন্যায়’ পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে উত্তরের পাঁচ জেলার বিধায়ক, আইজিপি, পুলিশ সুপার এবং প্রশাসনের শীর্ষ আমলাদের নিয়ে এক প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে বসবেন তিনি। আর শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় আয়োজিত এই প্রথম প্রশাসনিক বৈঠককে কেন্দ্র করে গোটা উত্তরবঙ্গজুড়ে ব্যাপক তৎপরতা তৈরি হয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর, সামনেই বর্ষাকাল কড়া নাড়ছে, তাই এই বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তরবঙ্গের চিরাচরিত সমস্যা – বন্যা, পাহাড়ি ধস, হড়পা বান এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি।
এর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং চা বলয়ের শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি ও চিকিৎসা পরিষেবার সমস্যা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রাজ্যে সরকার বদল হতেই উত্তরবঙ্গের বেআইনি নির্মাণ, সরকারি জমি দখল এবং নদী থেকে অবৈধভাবে বালি ও পাথর পাচারকারী মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য রুখতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দীর্ঘদিনের বকেয়া উন্নয়নমূলক কাজ ত্বরান্বিত করা এবং পাহাড় ও সমতলের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য। নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত আগামী দিনে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও মজবুত করবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। একদিকে বিমানবন্দরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মেগা এন্ট্রি, অন্যদিকে উত্তরকন্যায় প্রথম প্রশাসনিক বৈঠক থেকে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা- সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অলিন্দে এখন এক নতুন ভোরের সূচনা।