যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত অর্থলগ্নিকারী ও কুখ্যাত শিশু যৌন নিপীড়ক প্রয়াত জেফরি এপস্টেইন ক্যারিবীয় অঞ্চলে তার ব্যক্তিগত দ্বীপে একটি রহস্যময় ভবন নির্মাণ করেছিলেন যেটাকে তিনি ‘মসজিদ’ বলে দাবি করতেন। ভবনটির জন্য পবিত্র কাবার গিলাফ ও কিসওয়া সংগ্রহও করেছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত এপস্টেইন ফাইলসে এই তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, ক্যারিবীয় সাগরের লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ডে অবস্থিত এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে একটি নীল-সাদা ডোরাকাটা ভবন তৈরি করা হয়। চতুষ্কোণ আকৃতির ভবনটির ওপর একটি সোনালি গম্বুজও ছিল। একাধিক জায়গায় এপস্টেইন এটাকে ‘মসজিদ’ বলে উল্লেখ করেছেন।যেমন, ভবনটি সাজানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের টাইলস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উজবেকিস্তানের এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে চিঠিতে এপস্টাইন লিখেছিলেন, ‘এটা দেখতে পুরনো ধাঁচের হবে… এটা মসজিদের মতো একটি ভবনের ভেতরের দেয়ালের জন্য লাগবে, আমি এর কিছু নমুনা দেখতে আগ্রহী।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি নিয়ে নানা জল্পনা ছিল—কেউ এটাকে সংগীতকক্ষ, কেউ প্যাভিলিয়ন, আবার কেউ গোপন উপাসনালয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ভবনটি আসলে নামাজের স্থান হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ধর্মের প্রশ্নে এপস্টেইন নিজেকে ‘ধমনিরপেক্ষ ইহুদি’ বলে পরিচয় দিতেন।
নথিগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, আরবি ও মুসলিম শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি এপস্টেইনের গভীর অনুরাগ ছিল। যার প্রমাণ মেলে আমিরাতের সুলতান ও লজিস্টিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাবেক প্রধান আহমেদ বিন সুলায়েম এবং বর্তমান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ও যোগাযোগ থেকে।
এপস্টেইন ফাইলসের অংশ হিসেবে মার্কিন বিচার বিভাগ যেসব ছবি প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে একটি ছবিতে আহমেদ বিন সুলায়েমের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত মেলে। ছবিতে দেখা যায়, এপস্টেইন ও আহমেদ বিন সুলায়েম রান্নাঘরে রান্না করছেন। অন্য একটি ছবিতে এপস্টেইনকে সৌদি যুবরাজের সঙ্গেও দেখা গেছে।
এপস্টেইন ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা জিনিস সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে বা সেগুলো মেঝের গালিচা হিসেবে ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলতেন। ২০০৩ সালে ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, তার কাছে বিশ্বের বৃহত্তম পার্সিয়ান গালিচা আছে যা কোনো এক মসজিদ থেকে সংগৃহীত।
২০১৭ সালে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন সৌদি আরবের রাজ দরবারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এই নেটওয়ার্ক তাকে মক্কার কাবার তিনটি অমূল্য নিদর্শন পাইয়ে দিতে সাহায্য করে: এক. কাবার অভ্যন্তরের গিলাফ: কাবার ভেতরের দেয়ালে থাকা অত্যন্ত দুর্লভ কারুকাজ করা কাপড়।
দুই. কিসওয়া: কাবার বাইরের কালো প্রচ্ছদ, যা প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে স্বর্ণ ও রুপার সুতো দিয়ে তৈরি করা হয়। তিন. মক্কার বিশেষ কারখানার নিদর্শন: কাবার গিলাফ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট মক্কার রাজকীয় কারখানা থেকে সংগৃহীত বিশেষ কাপড়।

সৌদি প্রতিনিধি আজিজা আল আহমাদি এক ই-মেইলে এপস্টেইনকে এই নিদর্শনের গুরুত্ব বুঝিয়ে লিখেছিলেন, ‘এই কালো অংশটি অন্তত ১ কোটি মুসলিমের স্পর্শ পেয়েছে। তাঁরা তাঁদের প্রার্থনা, চোখের পানি এবং আশা এই কাপড়ের গায়ে রেখে গেছেন।’
কাবার গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। প্রতি বছর এটি নতুন করে তৈরি করা হয় এবং পুরোনো অংশ বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ বা বিতরণ করা হয়। সেই গিলাপ ও কিসওয়া এপস্টেইনের মতো একজন কুখ্যাত শিশু নিপীড়কের সংস্পর্শে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
যৌন নিপীড়নের মামলায় ২০১৯ সালে গ্রেফতার হন এপস্টেইন। একই বছরের আগস্টে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুর পর তার রহস্যময় জগৎ নিয়ে অনেক জল্পনা শুরু হয়। ২০১৭ সালের হারিকেন মারিয়া’র কবলে পড়ে দ্বীপের সেই ভবনের অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে কাবার সেই পবিত্র নিদর্শনগুলো পরে উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।