ভারত থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবাহিত তিস্তা নদীকে ঘিরে ফের তীব্র কূটনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। তিস্তা নদীর প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ যে অনড়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সে দেশের সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে এই প্রকল্পে চিনের আগ্রহ প্রকাশ ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশ সব প্রতিবেশী দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে সেই সম্মান পারস্পরিক হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর কথায়, ‘তিস্তা প্রকল্প সম্পূর্ণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। দেশের স্বার্থে যা প্রয়োজন, আমরা তাই করব। আমাদের উন্নতিতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলির খুশি হওয়ারই কথা। তবু কেউ যদি অসন্তুষ্ট হন, তাহলে রাজশাহীর আম পাঠিয়ে তাঁকে খুশি করার চেষ্টা করব।’ তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের বেজিং সফরের পর থেকেই তিস্তা প্রকল্পে চিনের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে জল্পনা বাড়ে। সফরকালে তিনি চিনের জলসম্পদমন্ত্রী লি গুওইংয়ের সঙ্গে তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে বৈঠক করেন। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন জানান, নদী ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ ও চিন নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
সূত্রের খবর, তিস্তা নদী মাস্টার প্ল্যানের পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বেজিং। এর ফলে প্রকল্পে চিনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের একাংশের মত। তিস্তা নদীর অববাহিকা ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি অবস্থিত। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডরই মূল ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির একমাত্র স্থল যোগাযোগের সেতুবন্ধন। ফলে তিস্তা অববাহিকায় কোনও বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে চিনের অংশগ্রহণকে দিল্লি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখছে।

যদিও চিন এই ইস্যুতে ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। সম্প্রতি বেজিংয়ে এক সাংবাদিক বৈঠকে চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন প্রকল্প বাংলাদেশের জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তিনি জানান, এই প্রকল্পে বাংলাদেশকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত চিন। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, চিন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনও তৃতীয় দেশকে লক্ষ্য করে নয় এবং এই সহযোগিতা তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত হওয়া উচিত।বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চিনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ শুধু জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান এবং চিনের সক্রিয়তা আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর কূটনৈতিক মহলের।