বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ভোটে কারচুপির অভিযোগে সরব হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, ১০০টিরও বেশি আসনে ভোট লুট হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করেনি। কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, বাস্তবে সেই অভিযোগকে আদালতে নিয়ে যেতে আগ্রহ দেখাননি অধিকাংশ পরাজিত প্রার্থী।
কলকাতা হাই কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে তৃণমূলের মাত্র ৮ জন প্রার্থী নির্বাচন মামলা বা ইলেকশন পিটিশন দায়ের করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অন্যদিকে, বিজেপি ছ’টি আসনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সব মিলিয়ে হাই কোর্টে ১৪টি ইলেকশন পিটিশন জমা পড়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনে পাহাড়ের তিনটি আসন বাদ দিয়ে ২৯১টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তৃণমূল। তার মধ্যে জয় এসেছে মাত্র ৮০টি আসনে। অর্থাৎ ২১১ জন পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮ জন আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, যদি সত্যিই ১০০টির বেশি আসনে অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে বাকিরা কেন আইনি লড়াইয়ে নামলেন না?
দলের একাধিক নেতার মতে, নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা করতে গেলে পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে সাফল্য পাওয়া কঠিন। তৃণমূলের এক বিধায়কের কথায়, ‘জনতার রায়কে শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়াই শ্রেয়। প্রমাণ ছাড়া মামলা করে লাভ নেই।’ দলীয় সূত্রের খবর, ভোটের ফল প্রকাশের পর অনেক প্রার্থীকে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে অধিকাংশই সেই পথে হাঁটেননি। অনেকের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগতভাবে মামলা করলে দল থেকেও বিশেষ সহায়তা মিলবে না।
যাঁরা মামলা করেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পাণ্ডবেশ্বরের নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, গোপীবল্লভপুরের অজিত মাহাতো, বিনপুরের বিরবাহা হাঁসদা, ঝাড়গ্রামের মঙ্গল সোরেন, মানবাজারের সন্ধ্যারানি টুডু, রাজারহাট-নিউটাউনের তাপস চট্টোপাধ্যায় এবং পটাশপুরের পীযূষকান্তি পণ্ডা। অন্যদিকে, অল্প ভোটে পরাজিত হয়েও অনেক তৃণমূল প্রার্থী আদালতে যাননি। সাতগাছিয়ার সোমাশ্রী বেতাল, জাঙ্গিপাড়ার স্নেহাশিস চক্রবর্তী, রায়নার মন্দিরা দোলুই বা কাশীপুর-বেলগাছিয়ার অতীন ঘোষের মতো নেতারা ফল মেনে নিয়েছেন।

আইনজীবীদের একাংশের মতে, নির্বাচন সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। অতীতের বহু মামলার এখনও চূড়ান্ত রায় হয়নি। ফলে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইনি পথে ফল বদলের সম্ভাবনা খুবই সীমিত। সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা ‘ভোট লুট’-এর অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দলের অন্দরেই। কারণ অভিযোগ যতটা জোরালো, আদালতের পথে হাঁটার ক্ষেত্রে ততটা উৎসাহ দেখা গেল না তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে।