আকাশে উড়ল ‘নটি বয়’। সফল উৎক্ষেপণ হল ইসরোর GSLV-F17 রকেটের। শুক্রবার ভোরে শ্রীহরিকোটা থেকে রওনা দেয় রকেটটি। তার সঙ্গে ছিল পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ EOS-05। এই উৎক্ষেপণকে ইসরোর জন্য বড় সাফল্য বলা হচ্ছে। কারণ, এই মিশনে একসঙ্গে একাধিক নজির তৈরি হয়েছে। GSLV-এর মাধ্যমে এই প্রথম এত ভারী উপগ্রহ পাঠানো হল। একই সঙ্গে ভারতের প্রথম নির্দিষ্ট ইমেজিং উপগ্রহ জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে কাজ করতে চলেছে EOS-05। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ইসরোর আরও একটি অসাধারণ কৃতিত্ব। ভারতের মহাকাশ গবেষণায় এটি গর্বের মুহূর্ত।
৩৬ হাজার কিলোমিটার উপর থেকে ভারতের দিকে নজর
বেশির ভাগ পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ অনেক নিচু কক্ষপথে ঘোরে। সাধারণত পৃথিবীর কয়েকশো কিলোমিটার উপর দিয়ে তারা ঘুরতে থাকে। EOS-05-এর ক্ষেত্রে ছবিটা অন্য রকম। উৎক্ষেপণের পরে উপগ্রহটিকে সাব-জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে নিজের প্রপালশন সিস্টেম ব্যবহার করে আরও উপরে উঠবে EOS-05। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছবে। এই কক্ষপথের বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এই উচ্চতায় উপগ্রহের ঘূর্ণনের সময় পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে একটি বড় অঞ্চলের উপর দীর্ঘ সময় নজর রাখা যায়। অর্থাৎ, ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার উপর বার বার নজর দেওয়া সম্ভব হবে।
সীমান্ত ও কৌশলগত নজরদারিতেও গুরুত্বপূর্ণ
EOS-05-কে ‘স্পাই স্যাটেলাইট’ বলা ঠিক নয়। ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন নিজেই এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে এর তথ্য জাতীয় স্বার্থে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ উপগ্রহটি খুব ঘন ঘন দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ছবি দিতে পারবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় রাস্তা, পরিকাঠামো, জলাধার বা জমির ব্যবহারে বড় পরিবর্তন হলে তা নজরে আসতে পারে। কোনও এলাকায় দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা বুঝতেও সাহায্য করবে এই উপগ্রহের তথ্য। তবে এই উপগ্রহের মূল উদ্দেশ্য শুধু নিরাপত্তা নয়। কৃষি, বনাঞ্চল, জলসম্পদ এবং দুর্যোগ মোকাবিলাতেও এর তথ্য ব্যবহার করা যাবে।
ঝড়-বৃষ্টি থেকে বিপর্যয়, সবেতেই নজর
EOS-05-এর ক্যামেরা একাধিক তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ছবি তুলতে পারবে। দৃশ্যমান আলো, ইনফ্রারেড, মাল্টিস্পেকট্রাল এবং হাইপারস্পেকট্রাল—সব ক্ষেত্রেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে এটি। ফলে শুধু সাধারণ ছবি নয়। মাটির অবস্থা, জল, গাছপালা এবং বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যও বোঝা সম্ভব হবে। সাইক্লোন, মেঘভাঙা বৃষ্টি, বজ্রঝড়ের মতো দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কৃষিক্ষেত্রেও লাভ হবে। কোথায় ফসলের অবস্থা কেমন, কোথায় জলাভাব, কোথায় জমির পরিবর্তন হচ্ছে—এই ধরনের তথ্য পাওয়া যেতে পারে দ্রুত।
GSLV-এর সবচেয়ে ভারী উপগ্রহ
EOS-05-এর ওজন ২,৩৬৭ কিলোগ্রাম। ইসরোর চেয়ারম্যানের দাবি, এটিই এখনও পর্যন্ত GSLV-এর মাধ্যমে উৎক্ষেপিত সবচেয়ে ভারী উপগ্রহ। GSLV-F17 রকেটটির উচ্চতা ৫১.৭ মিটার। উৎক্ষেপণের সময় ওজন ছিল প্রায় ৪২০.৫ টন। এটি তিন ধাপের রকেট। এর তৃতীয় ধাপে রয়েছে ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন।
এ বারের উৎক্ষেপণে আরও একটি চমক রয়েছে। আগে যে কক্ষপথে উপগ্রহ পৌঁছবে বলে হিসাব করা হয়েছিল, তার থেকেও বেশি উচ্চতায় EOS-05-কে পৌঁছে দিয়েছে রকেটটি। পরিকল্পিত উচ্চতা ছিল প্রায় ২৯,৯৩৪ কিলোমিটার। শেষ পর্যন্ত উপগ্রহটি প্রায় ৩১ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছয়। এর পর নিজের ইঞ্জিন ব্যবহার করে আরও উপরে উঠবে EOS-05।

২০২১-এর ব্যর্থতার পর বড় প্রত্যাবর্তন
এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, ২০২১ সালে GSLV-এর একটি বড় ব্যর্থতা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১২ অগস্ট GSLV-F10-এর মাধ্যমে EOS-03 উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রায়োজেনিক উপরের ধাপে সমস্যা দেখা দেয়। ইঞ্জিন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না করায় মিশনটি ব্যর্থ হয়। তার পর থেকেই ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি এবং GSLV-এর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর দিকে জোর দেয় ইসরো।
এ বারের সাফল্য তাই শুধু একটি নতুন উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো নয়। পুরনো ব্যর্থতা কাটিয়ে GSLV-এর সক্ষমতা ফের প্রমাণ করার ঘটনাও। ইসরোর চেয়ারম্যান মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রথম GSLV-এ প্রায় ১,৫৩৬ কেজি ওজনের উপগ্রহ পাঠানো হয়েছিল। ধাপে ধাপে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন ২,৩৬৭ কেজির উপগ্রহও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।
চলতি বছরের আর একটি ধাক্কার পর স্বস্তি
চলতি বছরও ইসরো একটি বড় ধাক্কা খেয়েছিল। জানুয়ারিতে PSLV-C62 মিশন সফল হয়নি। ওই মিশনে ১৬টি উপগ্রহ ছিল। কিন্তু রকেটের তৃতীয় ধাপে সমস্যা দেখা দেওয়ায় উপগ্রহগুলি নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছতে পারেনি। সেই ঘটনার পর GSLV-F17-এর সাফল্য ইসরোর জন্য বাড়তি স্বস্তির। কারণ, সামনে রয়েছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ অভিযান।