টলিপাড়ার আবহটা বেশ কিছুদিন ধরেই মেঘলা। ৪২ বছর বয়সে চলে গেলেন অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল মৃত্যুর ধাক্কা সামলে ওঠবার আগেই নিজেকে শেষ করে দিলেন পরিচালক অনীক দত্ত। বিনোদন জগতের এই একের পর এক নক্ষত্রপতন এবং তাঁদের চলে যাওয়ার পর সমাজমাধ্যমে শোকজ্ঞাপন ও মায়াকান্নার যে ঢল নেমেছে, তা দেখে আর চুপ থাকতে পারলেন না বিশিষ্ট অভিনেত্রী তথা ব্লুজ প্রোডাকশনের কর্ণধার স্নেহাশিস চক্রবর্তীর স্ত্রী রূপসা চক্রবর্তী। নিজের সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে এক দীর্ঘ, মননশীল এবং অত্যন্ত কড়া পোস্টে ভার্চুয়াল দুনিয়ার ভণ্ডামির মুখোশ টেনে ছিঁড়লেন অভিনেত্রী।
চলে যাওয়ার পর হাজার পোস্টের চেয়ে, বেঁচে থাকতে একটা কথাই যথেষ্ট
রূপসা তাঁর পোস্টে কোনো রাখঢাক না রেখেই লিখেছেন, মানুষকে যদি সত্যিই ভালোবাসেন, তবে সেই ভালোবাসার কথা মানুষটা বেঁচে থাকতেই তাকে জানান। তাকে অনুভব করান সে আপনার কাছে কতটা প্রিয়, কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সময় চলে যাওয়ার পরে হাজারো শব্দ, হাজারো পোস্ট, হাজারো স্মৃতিচারণ এর থেকেও জীবিত অবস্থায় বলা একটি কথা, যেমন তুমি আমার খুব প্রিয়, খুব আপন, খুব ভালো লাগে তোমাকে, এই কথা গুলো অনেক বেশি মূল্যবান।
আসলে রূপসার এই আক্ষেপ বর্তমান রূপোলি দুনিয়ার এক জ্বলন্ত বাস্তব। অনীক দত্তর মতো প্রতিভাবান অভিনেতা যখন একাকীত্ব বা অবসাদের মধ্যে দিয়ে যান, তখন অনেকেই খোঁজ নেন না। পরিচালক বেঁচে থাকতে নন্দনে ব্রাত্য থেকে যান, অথচ মৃত্যুর পর তাঁদের নিয়েই সোশ্যালে মোমবাতি জ্বালানোর হিড়িক পড়ে যায়। নন্দনে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়।

ট্রোলিংয়ের নামে ছোট না করে হাতটা ধরুন
ইদানীং টলিপাড়া হোক বা নেটপাড়া, কাউকে নিয়ে ট্রোল করা বা কাঠি করা এক ধরণের বিনোদনে পরিণত হয়েছে। পর্দার পেছনের মানুষের আসল লড়াইটা কজনই বা দেখে! সেই প্রসঙ্গ টেনে রূপসা আরও যোগ করেন, আমরা প্রায়ই মানুষের হাসিমুখ দেখি, কিন্তু তার ভেতরের ক্লান্তি, অবসাদ, একাকীত্ব দেখতে পাই না। আর কেউ যখন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, তখন তাকে নিয়ে মজা করা, ট্রোলিং করা, সোশ্যাল মিডিয়াতে আঘাত করে কথা বলা, এইভাবে মানুষটিকে বিচার না করে, যদি সে ভুল করে সেই ভুল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, তাকে শিক্ষা দেওয়ার নামে সবার সামনে ছোটো না করে পারলে তার পাশে দাঁড়ান।
রূপসার স্পষ্ট দাবি, নীতিপুলিশ সেজে কাউকে সবার সামনে অপমান করার চেয়ে, অন্তরালে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত, তুমি কেমন আছো? শোনা উচিত তার ভেতরের না-বলা কথাগুলো।
মানুষ চলে যাওয়ার পর ভালোবাসা দেখানো খুব সহজ!
পোস্টের শেষে এসে রূপসা যেন এক চাবুক মেরেছেন সোশ্যাল মিডিয়ার মেকি সহানুভূতিকে। তিনি লেখেন, ‘সম্ভব হলে তাকে একটু ভালোবাসা দিন, একটু সময় দিন, একটু ভরসা দিন। হয়তো আপনার সামান্য আন্তরিকতাই তাকে আবার জীবনের প্রতি আশাবাদী করে তুলতে পারে। মানুষ চলে যাওয়ার পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালোবাসা প্রকাশ করা খুব সহজ, কিন্তু মানুষটা বেঁচে থাকতে তার অন্ধকার সময়ে হাতটা ধরে রাখা, সেটাই আসল ভালোবাসা।’
অনীক দত্ত এবং রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর আবহে রূপসার এই পোস্টটি এই মুহূর্তে নেটপাড়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল। টলিপাড়ার বোদ্ধারাও মনে করছেন, স্নেহাশিস-পত্নীর এই সপাট এবং সংবেদনশীল বার্তা হয়তো ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের ট্রোলিং সংস্কৃতি এবং মেকি শোকপ্রকাশের মানসিকতায় কিছুটা হলেও বদল আনতে সাহায্য করবে।