Taslima Nasrin। হুথিদের হাত থেকে আল্লাহর ঘর বাঁচাতে ইহুদিদের সাহায্য নিতে হচ্ছে

Spread the love

মুসলিম দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ সৌদি আরব। কিন্তু হুথিদের হামলা শুরু হতেই সেই শক্তির ছবিটা যেন একটু অন্যরকম হয়ে উঠেছে। মক্কা-মদিনার নিরাপত্তা থেকে লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে রিয়াধের সামনে এখন একের পর এক প্রশ্ন। আর সবচেয়ে বড় অস্বস্তি, যাঁদের ‘বন্ধু’ ভেবে পাশে পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের কাউকেই এখনও সরাসরি রণক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। তার মধ্যেই ইজরায়েলের সাহায্য চাওয়ার খবর সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে উঠেছে।

এই খবর নিয়েই তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর—বিপদের সময় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মন্তব্যে উঠে এসেছে সেই চেনা দ্বন্দ্ব: মঞ্চে শত্রু-মিত্রের সংজ্ঞা একরকম, কিন্তু আকাশে ড্রোন উড়লে হিসেবটা অন্যরকম। এই নিয়ে তসলিমা লেখেন –

‘আল্লাহর ঘরকে মুসলমান হুতিদের হাত থেকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের ইহুদিদের সাহায্য নিতে হচ্ছে , যাদের এতকাল মুসলমানের চিরশত্রু বলে গালি দেওয়া হয়েছে!

এদিকে কদিন আগেই খুব ধুমধাম করে মক্কা চুক্তি হলো—সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক। এক দেশ আক্রান্ত হলে নাকি সবাই আক্রান্ত।

এখন সৌদি আক্রান্ত। পাকিস্তান-তুরস্কের টিকিটি দেখা যাচ্ছে না।

হুতিদের প্রতিরোধ করার জন্য CENTCOM-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা নিচ্ছে সৌদি আরব।

নিয়তির কী পরিহাস!

মুখে— মুসলিম উম্মাহ।

কাগজে— মক্কা চুক্তি।

বিপদে— ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য।

এখন ইসরায়েলের চোখ-কান ধার নিচ্ছে সৌদি; কাল তার ঢালটাও ধার নিতে হয় কি না কে জানে!

ধর্ম বলে, কে আপন, কে পর।

ড্রোন এসে বলে—আমাকে নামিয়ে বাঁচা আল্লাহর ঘর।

রাজনীতিরও কী অসাধারণ ধর্মবোধ!

ড্রোন মাথার ওপর না আসা পর্যন্ত শত্রু চেনা যায়।

ড্রোন মাথার ওপর এলে শুধু রাডার চেনা যায়।

ঠিকই, বিপদে ধর্ম নয়, রাডারই ভরসা।’

উল্লেখ্য, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। জেদ্দা ও তইফের পাশাপাশি মক্কা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। হামলার আশঙ্কায় সৌদি প্রশাসন সতর্কতা বাড়িয়েছে। অর্থাৎ, যে সৌদি আরব অন্যদের নিরাপত্তার পাঠ পড়ায়, তাকেই এখন নিজের আকাশসীমা আর গুরুত্বপূর্ণ শহর নিয়ে বারবার হিসেব কষতে হচ্ছে।

পরিস্থিতির আরেকটি অদ্ভুত দিক হল ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর দুর্বল হয়ে পড়ার দাবি। কিছু ঘাঁটি ছেড়ে সেনা সরে যাওয়ার পর সেখানে থাকা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের একাংশ হুথিদের হাতে চলে গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকার দেওয়া অস্ত্রও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে একসময় যে অস্ত্র দিয়ে সৌদি শিবির শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল, সেই অস্ত্রই শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের হাতে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের মঞ্চে এর চেয়ে বড় বিদ্রূপ আর কী হতে পারে!

এদিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ নিয়ে বহু আলোচনা হলেও, সৌদি আরবের হয়ে পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি যুদ্ধে নামছে—এমন কোনও তথ্য এখনও সামনে আসেনি। অর্থাৎ জোটের নাম যত বড়, জরুরি সময়ে বুটের শব্দ ততটা জোরে শোনা যাচ্ছে না—অন্তত এই সংঘাতের ক্ষেত্রে ছবিটা তেমনই।

অগত্যা আমেরিকার দিকে তাকাতে হচ্ছে রিয়াধকে। কিন্তু ওয়াশিংটনের অবস্থাও বেশ কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক সংঘাতের চাপ রয়েছে, সামরিক সম্পদের উপরও বাড়তি চাপ পড়ছে। ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে আবার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আমেরিকার অনীহা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আর এখানেই আসে সবচেয়ে চমকপ্রদ খবর। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব ইজরায়েলের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছে। এই যোগাযোগে আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের মধ্যস্থতার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ এতদিনের কূটনৈতিক দূরত্ব, ধর্মীয় বিরোধ আর রাজনৈতিক ভাষণ এক পাশে; আকাশে ড্রোন দেখা দিলে রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র আর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিই নাকি শেষ কথা!

 

সব মিলিয়ে হুথিদের সাম্প্রতিক চাপ মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো সমীকরণকে যেন নতুন করে আয়নায় দাঁড় করিয়েছে। বন্ধুত্বের জোট, ধর্মীয় ঐক্য, কূটনৈতিক স্লোগান—সবকিছুর পর শেষ প্রশ্নটা যেন একটাই: বিপদের রাতে আকাশ থেকে ছুটে আসা ড্রোন থামাবে কে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *