আমেরিকার মাদক সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় ভারতের নাম রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ভারত সরকারের মাদকবিরোধী পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের নাম তালিকায় থাকার পরও কেন মোদীর প্রশংসা করলেন ট্রাম্প?
১৬ সেপ্টেম্বর আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে মোট ২৩টি দেশের নাম রয়েছে। এই তালিকায় ভারত ছাড়াও আফগানিস্তান, চিন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান এবং মায়ানমারের মতো দেশ রয়েছে। আমেরিকার বক্তব্য, কোনও দেশের নাম এই তালিকায় থাকলেই এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না যে সেই দেশের সরকার মাদকবিরোধী লড়াইয়ে কাজ করছে না। কোনও দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও সেই দেশের নাম তালিকায় আসতে পারে।
এই তালিকা প্রকাশের পরই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন ট্রাম্প। তিনি অবৈধ আফিম চাষ বন্ধ করার চেষ্টা এবং মাদক সরবরাহের চক্র নিয়ন্ত্রণে ভারতের পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে মাদকবিরোধী সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন। অর্থাৎ তালিকায় ভারতের নাম থাকলেও, ওয়াশিংটনের বক্তব্যে দিল্লির বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়নি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতকে সেই দেশগুলির তালিকায় রাখা হয়নি যাদের মাদকবিরোধী প্রচেষ্টাকে আমেরিকা স্পষ্টভাবে ‘ব্যর্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেই আলাদা তালিকায় আফগানিস্তান, বলিভিয়া, বর্মা, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার নাম রয়েছে। তাই ভারতের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তি এবং ব্যর্থ ঘোষণাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
ভারত ও আমেরিকার মধ্যে মাদকবিরোধী সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে দুই দেশের ড্রাগ পলিসি ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক হয়েছিল। সেখানে বেআইনি মাদক, মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ভারতও জানিয়েছিল, মাদক পাচার এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের অপব্যবহার ঠেকানো তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অফিয়াম বা আফিমের বিষয়টিও এখানে কিছুটা আলাদা। ভারতে আফিম চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারি লাইসেন্সের মাধ্যমে আফিম চাষ করা হয় এবং এই ফসল ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে বৈধ চাষের পাশাপাশি অবৈধ চাষ ও পাচার বন্ধ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য মূলত সেই অবৈধ অংশ নিয়ন্ত্রণে ভারতের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে।
আমেরিকার জন্য এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফেন্টানিলের মতো সিন্থেটিক মাদককে কেন্দ্র করে। এই ধরনের মাদক এবং এগুলি তৈরির রাসায়নিকের সরবরাহ নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন। তাই ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, নজরদারি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে আমেরিকা। বিশ্বের অন্যতম বড় ওষুধ উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় ভারতের ফার্মা ও কেমিক্যাল শিল্পও এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাই পুরো বিষয়টি দেখলে বোঝা যায়, আমেরিকার তালিকায় ভারতের নাম থাকা এবং ট্রাম্পের মোদীর প্রশংসা করা—দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। একদিকে আমেরিকা মাদক উৎপাদন ও পাচারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছে, অন্যদিকে ভারত যে সেই সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপ করছে, সেটিও স্বীকার করছে।
এই দ্বৈত বার্তার মধ্য দিয়ে আসলে ভারত-আমেরিকার মাদকবিরোধী সহযোগিতার গুরুত্বই সামনে এসেছে। ওয়াশিংটন আরও কড়া নজরদারি চাইলেও দিল্লির সঙ্গে একযোগে কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী। আর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সহযোগিতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।