দলের নিচুতলায় তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এবং দলবিরোধী অনৈতিক কাজের অভিযোগে এবার আরও কড়া পদক্ষেপের পথে রাজ্য বিজেপি। দলের ভিতরে ‘তোলাবাজ’দের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। নিচুতলার সংগঠনে কোনও ধরনের বিচ্যুতি যাতে দলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়েও জেলা নেতৃত্বকে সতর্ক করা হয়েছে।
রাজ্য বিজেপি সূত্রে খবর, দলের মধ্যে কারা তোলাবাজি বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত, কারা দলবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত এবং কারা সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন, তা খতিয়ে দেখবেন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকরা। প্রয়োজন হলে তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ করার বিষয়েও রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। দলের নিচুতলায় কোনও অনৈতিক কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না বলেই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই নিচুতলার নেতা-কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠছে। কোথাও তোলাবাজি, কোথাও সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগ, আবার কোথাও স্থানীয় স্তরে দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে অনৈতিক কাজের অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বারবার শীর্ষ নেতৃত্বকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। বিষয়টি যে রাজ্য নেতৃত্ব ভালভাবে নিচ্ছে না, সাংগঠনিক বৈঠকে তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
শুধু পর্যবেক্ষকদেরই নয়, সংশ্লিষ্ট জেলার সভাপতি এবং বিধায়কদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় স্তরে দলের কোনও নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে তোলাবাজি কিংবা অনৈতিক কাজের অভিযোগ উঠলে জেলা সভাপতি এবং বিধায়কদের সক্রিয় হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। একইসঙ্গে জেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং বিধায়কদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য নেতৃত্বের কাছে খবর এসেছে, অনেক জেলাতেই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং বিধায়কের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় নেই। তার ফলে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সমন্বয় বজায় রেখে দলকে আরও ‘বিশুদ্ধ’ করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। দলের ভাবমূর্তি যাতে কোনওভাবেই স্থানীয় স্তরের নেতাদের কাজের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে, নিচুতলায় কোনও ধরনের বিচ্যুতি ধরা পড়লে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ফের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুক্রবার রাতে কোর কমিটির বৈঠকের পর শনিবারও সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে দীর্ঘক্ষণ সাংগঠনিক বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শমীক বলেন, রাজ্যবাসী শুধু জামা বদলের জন্য ভোট দেননি, জামার ভিতরের মানুষটার বদল চেয়েছেন। যেখানে বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে, সেখানেই দলীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
শমীকের বক্তব্যে উঠে আসে রাজ্যের রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, কোনও রাজনৈতিক দলই এমন নয় যার মধ্যে সামান্যতম বিচ্যুতি নেই। তবে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের শাসনের সময় যে ধরনের অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় বিজেপি কখনও গণপিটুনির রাজনীতির পথে হাঁটেনি। তাঁর দাবি, বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পথে যেতে চায় না।
শুক্রবারের কোর কমিটির বৈঠকেও দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আগামী দিনে আন্দোলনের রূপরেখা কী হবে, তা নিয়েও নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়। পাশাপাশি আসন্ন পুর নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বুথস্তরে সংগঠন মজবুত করা, সম্ভাব্য ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন, নির্বাচনী কৌশল এবং পুরভোটের প্রস্তুতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। অর্থাৎ একদিকে নিচুতলার নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজের অভিযোগে কড়া নজরদারি, অন্যদিকে নির্বাচনের আগে বুথভিত্তিক সংগঠনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য—দুই দিকেই একসঙ্গে এগোতে চাইছে বঙ্গ বিজেপি।