শ্বেতশুভ্র সান্দাকফুতে বিষাদের সুর! প্রবল তুষারপাতের মাঝে মৃত্যু কলকাতার পর্যটকের

Spread the love

প্রকৃতির অমোঘ টান আর মার্চের শেষে রূপকথার মতো তুষারপাত- সব মিলিয়ে দার্জিলিংয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকফু এখন এক মায়াবী শ্বেতশুভ্র ক্যানভাস। পাইন আর রডোডেনড্রনের ডালে বরফের আস্তরণ দেখে মনে হতে পারে বসন্তের পাহাড়ে অসময়ে হাজির হয়েছেন ‘সান্তা বুড়ো।’ কিন্তু প্রকৃতির এই বিরল সৌন্দর্যের মাঝেই নেমে এল শোকের ছায়া। মনোরম এই পরিবেশ উপভোগ করতে গিয়ে কলকাতার এক পর্যটকের অকাল মৃত্যুতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

সূত্রের খবর, মৃত পর্যটকের নাম ইমরান আলি (৩৯)। তিনি কলকাতার পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন চৌরঙ্গী লেনের বাসিন্দা। জানা গিয়েছে, ইমরান তাঁর সঙ্গী রোহিত শেখরের সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ২৪ মার্চ শিলিগুড়িতে পৌঁছে পরদিন মানেভঞ্জনে রাত কাটান তাঁরা। এরপর ২৬ মার্চ সকালে টুংলুতে ওঠেন। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাঁরা টুংলুতেই থেকে যেতে বাধ্য হন। শনিবার সকালে যখন চারপাশ বরফে ঢাকা, বন্ধুকে সেই দৃশ্য দেখাতে ডাকতে যান রোহিত। কিন্তু অনেক ডাকাডাকিতেও ইমরান ঘুম থেকে না ওঠায় সন্দেহ হয় সঙ্গীর। পরে দেখা যায়, তিনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। এরপরেই স্থানীয়দের খবর দেওয়া হয়। স্থানীয়দের সহায়তায় সুখিয়াপোখরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা ইমরানকে মৃত ঘোষণা করেন। অত্যধিক ঠান্ডা নাকি উচ্চতাজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে এই মৃত্যু, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জিটিএ-র ভাইস চেয়ারম্যান রাজেশ চৌহান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

রোহিত শেখর বলেন, ‘আমরা ট্রেকিং করতে এসেছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় সম্ভব হয়নি। ওই কারণে গাড়িতে মানেভঞ্জনে চলে যাই। এরপর টাংলুতে।’ কিন্তু কেমন করে ইমরানের মৃত্যু হল সেটা জানাতে পারেননি রোহিত। তিনি বলেন, ‘শনিবার সকালের আবহাওয়া খুবই খারাপ ছিল। তবু আমি ওকে ডাকতে যাই বাইরের দৃশ্য দেখার জন্য। কিন্তু অনেক ডাকাডাকির পরও সাড়া দেয়নি। এরপর স্থানীয় লোকজনকে ডাকি।’ প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদেহ কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকেই পাহাড়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে, প্রায় দুই দশক পর মার্চের শেষে এমন ভারী তুষারপাত দেখে পর্যটকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস থাকলেও, বিপত্তি বেড়েছে যাতায়াতে। রাস্তাঘাট পুরু বরফে ঢেকে যাওয়ায় ল্যান্ড রোভার চলাচল করতে পারছে না। ফলে বহু পর্যটক এখন বিভিন্ন হোমস্টে-তে কার্যত বন্দি। প্রকৃতির এই অসাধারণ রূপ দেখার আনন্দের মাঝেই এক তরতাজা প্রাণের প্রয়াণে শোকাতুর পাহাড়ের পর্যটন মহল।

দার্জিলিং জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সান্দাকফুতে তুষারপাতের কারণে পর্যটকদের সাবধানতা অবলম্বন করে যাতায়াত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে দু’দিন ওই এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও টুরিস্ট গাইড, ল্যান্ড রোভার অ্যাসোসিয়েশন এবং প্রশাসনের সবস্তরের আধিকারিকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের কারও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা থাকলে সান্দাকফু যাওয়া নিষেধ। রাস্তায় জমে থাকা তুষার সরানোর কাজে গতি আনার নির্দেশও দিয়েছে প্রশাসন। দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক হরিশংকর পানিক্কর বলেন, ‘আমরা সমস্ত বিষয়ে নজর রাখছি। বিভিন্ন বিভাগের আধিকারিকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।’ আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সক্রিয়তা। বঙ্গোপসাগরের উপর একটি বিপরীত ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হওয়ায় সেই প্রভাব আরও জোরদার হয়ে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করছে। এর ফলে আগামী তিন থেকে চার দিন দার্জিলিং ও সিকিমে আরও তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সমতলেও বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *