অনীকের শেষ যাত্রার দায়িত্বে টলিপাড়ারই এক ‘ছদ্মবেশী’ গোয়েন্দা

Spread the love

হিমশীতল ঘর। চারপাশটা কেমন যেন অসাড়, নিথর। সেই ঘরের ভেতরে যখন বিজ্ঞানের আলোয় একটা ছিন্নভিন্ন শরীরের ব্যবচ্ছেদ চলছে, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে এক বিষণ্ণ গোয়েন্দা। ফরেন্সিক লিঙ্গুইস্টিক্সের রিপোর্ট টেবিলে এসে জমা পড়েছে। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— আত্মহত্যাই। শেষ চিঠির প্রতিটা শব্দে, অক্ষরে পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে একাকিত্ব আর অবসাদ, যা শেষ মিনিট পর্যন্ত কুড়ে কুড়ে খেয়েছে অনীক দত্তকে। প্রায় ৭০ ফুটের ওপর থেকে সেই মরণঝাঁপ… হাড়গোড় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে পরিচালকের। টলিপাড়ার ‘অপরাজিত’ পরিচালক এখন স্রেফ লাশকাটা ঘরের একটা ঠান্ডা ফাইল।

রাত ১ টার সেই ফোন, ওপারে বিধ্বস্ত লালবাজার

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত একটা। সমাজমাধ্যমে অভিনেতা তথা পরিচালক অরিত্র দত্ত বণিকের একটি ফেসবুক পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল। অরিত্র লিখছেন, সেই গভীর রাতে তাঁর ফোন থেকে শেষ কলটি গিয়েছিল মামলার তদন্তকারী অফিসারের কাছে। তিনি কলকাতা পুলিশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা, লালবাজারের ডিটেকটিভ বিভাগের হোমিসাইড শাখার প্রধান— দেবাশীষ দত্ত।

সারাদিন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে অনীকের ‘ছায়াসঙ্গী’ হিসেবে দেখা গিয়েছে এই দাপুটে অফিসারকে। শবদেহ সংগ্রহ থেকে পোস্টমর্টেম— প্রতিটা কাগজের তদারকি করেছেন তিনি। সারাদিন অজস্র ফোনের উত্তর দিয়ে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেবাশীষবাবু যখন অফিসের গাড়িতে চড়ে বাড়ি ফিরছেন, তখনই ফোন করেন অরিত্র। অরিত্র জানতেন, দেবাশীষ দত্ত ফোন ধরবেন। কারণ, এটা কোনো ব্রেকিং নিউজের তাগিদ ছিল না। ফোনটা ধরে কিছুক্ষণ চুপ ছিলেন লালবাজারের এই বাঘা অফিসার। অরিত্রর প্রশ্ন ছিল একটাই— ‘একজন ফিল্মমেকার হিসেবে আপনি আজ যা দেখলেন, সেইটুকু প্লিজ আমাকে বলুন।’

পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পরিচালক

বাস্তব জীবনে খুন, রক্ত, ক্রাইম আর ক্রিমিনাল দেবাশীষ দত্তের নিত্যসঙ্গী। ভয়ংকর সব কেস তুড়ি মেরে সমাধান করেছেন। কিন্তু উর্দির আড়ালে দেবাশীষবাবুর আরও একটা সত্তা আছে। তিনি নিজে সিনেমা বানাতে আর সিনেমার জন্য লিখতে ভালোবাসেন। তাঁর তৈরি কাজ দেশ-বিদেশের ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে ওটিটি দুনিয়ায় সমাদৃত। অরিত্র জানতেন, আর পাঁচটা কেসের চেয়ে আজকের দিনটা দেবাশীষবাবুর কাছে সম্পূর্ণ আলাদা।

ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল লালবাজারের এই দাপুটে কর্তার ভারী, আবেগঘন গলা—

“আমি অনীক দত্তর ছবি খুব ভালোবাসতাম। বহুবার ইচ্ছে ছিল, ওনার সাথে একবার দেখা করব। দেখা হলো আজ… কিন্তু তখন ওনার পোস্টমর্টেম চলছে। আমি ভাবিনি এইভাবে দেখা হবে রে। এখন খুব কষ্ট হচ্ছে মনে।”

রঙিন দুনিয়ার খোঁজে থাকা মানুষটি সাদা-কালোয় বিলীন

দেবাশীষবাবুর এই কথার পর অরিত্র আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, লালবাজারের দুর্দণ্ডপ্রতাপ দেবাশীষ দত্ত আসলে শুধু একটা মামলার ফাইল বন্ধ করেননি, তিনি হারিয়েছেন তাঁর এক অত্যন্ত প্রিয় ফিল্মমেকারকে। হয়তো, এই রক্তের দুনিয়া, অপরাধের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে যে মানুষটার সিনেমা দেখে তিনি সিনেমার রঙিন দুনিয়া এক্সপ্লোর করার স্বপ্ন দেখতেন, সেই পছন্দের মানুষটাই আজ সব রঙ মুছে সাদা-কালো ফ্রেমে বিলীন হয়ে গেলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *