পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন জেলবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। শনিবারই তোষাখানা-২ দুর্নীতি মামলায় তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট। তারই প্রতিবাদে পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভের কথা বলেছেন ইমরান খান। আর পরিস্থিতি আঁচ করেই রাওয়ালপিন্ডির চারদিকে কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে প্রশাসন।
রবিবার মধ্যরাতে এক্স-হ্যান্ডলে ইমরান খান বলেন, ‘আমি সোহেল আফ্রিদিকে (খাইবার পাখতুখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী) রাস্তার আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার জন্য একটি বার্তা পাঠিয়েছি। গোটা দেশকে তার অধিকারের জন্য জেগে উঠতে হবে।’ তারপরেই ইমরান জানান, এই রায় তার জন্য বিস্ময়কর নয়। তাঁর দাবি, কোন প্রমাণ ছাড়াই আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ না করে তড়িঘড়ি করে এই রায় দেওয়া হয়েছে। এমনকী তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্যও শোনা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ইসলামাবাদ হাইকোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে জেল থেকে ইমরান খান কী ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এক বিবৃতিতে এই রায়কে ‘অসাংবিধানিক, অবৈধ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিকৃষ্ট উদাহরণ’ বলে উল্লেখ করেছে।
ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি বিক্ষোভের ডাক দিতেই রাওয়ালপিন্ডি জুড়ে ১,৩০০ জনেরও বেশি পুলিশ আধিকারিক এবং নিরাপত্তা কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুসারে, পিটিআই কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভের শঙ্কায় ইতিমধ্যে রাওয়ালপিন্ডি মোতায়েন করা হয়েছে দুইজন পুলিশ সুপার, সাতজন ডেপুটি সুপার, ২৯ জন ইন্সপেক্টর এবং স্টেশন হাউস অফিসার, ৯২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ৩৪০ জন কনস্টেবল। এছাড়াও এলিট ফোর্সের সাত কমান্ডো, ২২ জন র্যাপিড ইমার্জেন্সি এবং সিকিউরিটি অপারেশনস কর্মী ও দাঙ্গা-বিরোধী ম্যানেজমেন্ট উইং-এর ৪০০ সদস্যকেও মোতায়েন করা হয়েছে।

তোষাখানা-২ দুর্নীতি মামলা কী?
ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এফআইএ) রেকর্ড অনুসারে, একটি দামি বুলগারি গয়নার সেটকে ঘিরেই এই দুর্নীতির সূত্রপাত। ২০২১ সালের মে মাসে সৌদি আরব সফরের সময় ইমরান খানকে একটি দামী গয়নার সেট উপহার দেন সে দেশের ক্রাউন প্রিন্স। অভিযোগ, সরকারি নিয়ম ভেঙে অত্যন্ত কম দামে সেই গয়নাটি কিনে নিয়েছিলেন ইমরান খান। এই উপহার তোষাখানায় জমা দেয়া হয়নি এবং প্রকৃত মূল্যও গোপন করা হয়। গয়নার মূল্যায়ন করেন বেসরকারি মূল্য নির্ধারক সোয়াইব আব্বাসি এবং পরবর্তীতে শুল্ক বিভাগ। সেখান থেকেই বিষয়টিকে ঘিরে শুরু হয় আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া। তোষাখানা–২ মামলায় ইমরান খান ও তার স্ত্রী অভিযুক্ত হয় ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই। সেদিন ‘ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (ন্যাব)’ আদিয়ালা জেল থেকে তাঁদের গ্রেফতার করে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা ৩৭ দিন ন্যাবের হেফাজতে ছিলেন। পরে ২০ আগস্ট ন্যাব মামলাটি নিয়ে দায়রা আদালতে রেফারেন্স দাখিল করে।
মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে। আদিয়ালা জেলে প্রথম শুনানি হয়। যেখানে সেন্ট্রাল অঞ্চলের বিশেষ বিচারক শরুখ আরজুমান্দ সভাপতিত্ব করেন। এরপর বুশরা বিবিকে ২৩ অক্টোবর ইসলামাবাদের হাইকোর্ট জামিন দেয়। ইমরান খানও ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর জামিন পান। এরপর ১২ ডিসেম্বর দুইজনের বিরুদ্ধেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। প্রায় এক বছর ধরে বিচার চলেছে, এ সময় আদিয়ালা কারাগারে ৮০টিরও বেশি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষ ২৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেয় এবং ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন করে। রায় অনুসারে, ইমরান এবং বুশরাকে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ৩৪, ৪০৯ ধারার অধীনে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন (পিসিএ)-এর ৫ ধারার অধীনে অতিরিক্ত সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।