ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশ। এর মধ্যেই ইরানকে আবারও আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় বাধা দিলে ওমানে হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে এখন ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ ওড়াতে হবে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছাতে তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরাসরি যোগাযোগের পথ রয়েছে, যেখানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরও (আইআরজিসি) যুক্ত রয়েছে।
ওমানকে সরাসরি হামলার হুমকি
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান আলোচনার প্রসঙ্গেও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ওমান যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর হামলা চালাবে।
ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইয়িংস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ওমান যদি পথে আসে, আমরা তাদের ওপর ব্যাপক বোমা হামলা চালাব।’
ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে আলোচনা চলছে।
হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান সমঝোতার চেষ্টা
এদিকে ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ প্রণালির মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য আলাদা রুট ব্যবহারের বিষয়ে একটি যৌথ ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তী সময়ে জাহাজ চলাচলে কোনো ফি না নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াকে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে। ফলে ইরান-ওমানের এই উদ্যোগ ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে মতবিরোধ তৈরি করেছে।

৬০ দিনের সময়সীমা নিয়ে ইরানের ভিন্ন অবস্থান
গত ১৭ জুন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার আওতায় দুই পক্ষের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়ে আসছে। তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ইরান বলেছে, ‘৬০ দিনের ডেডলাইন’ নিয়ে এখন আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, এমওইউতে ৬০ দিনের কোনো নির্দিষ্ট ‘ডেডলাইন’ উল্লেখ ছিল না। বরং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা প্রয়োজন হলে বাড়ানোও সম্ভব ছিল।
বাঘাইয়ের দাবি, সমঝোতা স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করায় ওই সময়সীমার গুরুত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের ‘ব্যাপক ও গুরুতর’ চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে দুই দেশের মধ্যে প্রকৃত আলোচনা আর শুরুই হয়নি। ফলে ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা এখন অর্থহীন।
যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা
এদিকে আলোচনায় অচলাবস্থার পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে। ইরানি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভাঙতে ‘সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট’ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ফলে ৬০ দিনের সমঝোতার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও সংকুচিত হয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের আত্মসমর্পণের দাবি ও ওমানকে হামলার হুমকি, অন্যদিকে ইরানের চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে ঘিরে একটি নতুন সমঝোতা না হলে যুদ্ধের অবসান আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।