বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফা ভোটগ্রহণের আগেই রাজ্যের রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তাপ। নন্দীগ্রামের পর এবার নজর ঘুরেছে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র ভবানীপুরে। সেখানের অলিগলিতে এখন শেষ মুহূর্তের প্রচারের পারদ তুঙ্গে। তবে শনিবার এই হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে যা ঘটেছে, তা সম্ভবত বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভার অদূরে বিজেপির মাইক বাজার অভিযোগ থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর মিছিলে তৃণমূলের নির্বাচনী গান – সব মিলিয়ে এলাকা জুড়েই চলল টানটান উত্তেজনা। আর এই বিশৃঙ্খলার জেরে সভার মাঝপথে মেজাজ হারালেন মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে রণংদেহি মেজাজে ধরা দিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা।
নন্দীগ্রামের ভোট হয়ে গিয়েছে। বাকি ভবানীপুর। এবার সেখানে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। জোর কদমে চলছিল শেষ দফার প্রচার। শনিবার চক্রবেড়িয়া রোডে তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী সভা চলছিল। অভিযোগ, সভার খুব কাছেই বিজেপির পক্ষ থেকে মাইকিং শুরু করা হয়। জনসভার প্রচারের শব্দকে ছাপিয়ে অন্য একটি দলের মাইক বেজে ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই বক্তৃতায় ব্যাঘাত ঘটে। এরপর মাঝপথেই নিজের ভাষণ থামিয়ে দিতে বাধ্য হন মুখ্যমন্ত্রী। এই অনভিপ্রেত ঘটনায় তৃণমূল শিবিরের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তবে নাটকের তখনও অনেক বাকি ছিল।
শুভেন্দু অধিকারীর আক্রমণাত্মক রূপ
কিছুক্ষণ পরেই ঠিক একই ধরনের অভিযোগ তুলে সরব হন ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার যখন তিনি দলীয় কর্মীদের নিয়ে পায়ে হেঁটে জনসংযোগ সারছিলেন, তখন আচমকাই মাইকে বাজতে শুরু করে তৃণমূলের নির্বাচনী গান – ‘যতই করো হামলা আবার জিতবে বাংলা…।’ নিজের পদযাত্রার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের গান শুনে মেজাজ ঠিক রাখতে পারেননি শুভেন্দু। কালীঘাট ও ভবানীপুর থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরাসরি তাঁদের ওপর ফেটে পড়েন তিনি। কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিকদের উদ্দেশে ক্ষুব্ধ শুভেন্দু বলেন, ‘আপনারা কী এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে কথা বলছেন? ওঁর বাড়ির দিকে আমাদের প্রচারে যেতে দেননি, আমি সেই নির্দেশ মেনে চলেছি। কিন্তু এখন আমার অনুমোদিত কর্মসূচির মাঝে এই গান বাজছে কেন? আমি আপনার বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ জানাব।’ পরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিজেপি প্রার্থী বলেন, ‘তৃণমূল আজ নর্দমার জলে পরিণত হয়েছে। পুলিশ তাঁদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির দিকে যাওয়ার রাস্তা আমাদের জন্য বন্ধ করা হয়েছে, অথচ তৃণমূল যা খুশি তাই করছে। কিন্তু আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, এভাবে মমতাকে জেতানো যাবে না। হারাব..হারাব…হারাব…।’

বস্তুত, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই কালীঘাট ও আলিপুর থানার ওসি বদলে দিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বিজেপির কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। বদলে দেওয়া হয়েছে ওসি। তিনি বলেন, ‘আমি দেখছি তৃণমূল ভবানীপুরে হেরে গেছে তা বোঝা যাচ্ছে। আমাদের ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে একটি জনসংযোগ কর্মসূচি ছিল। ভবানীপুর থানার অংশে অনুমতি দিয়েছে, কালীঘাটের অংশে অনুমতি দেয়নি। তারপরই কালীঘাটের ওসিকে কমিশন হটিয়ে দিয়েছে। মাইকে গান বাজিয়েছিল..যতই করো হামলা, জিতবে বাংলার। এরা কে হরিদাস পাল?’
কী বলছে তৃণমূল?
পাল্টা তৃণমূলের দাবি, বিজেপিই উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। বেলেঘাটার তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষ বলেন, ‘আরে ভোটের পর নির্বাচন কমিশনটাই বদলে যাবে। একটি ট্যাঙ্ক আর রাফালটাও তো ঘুরিয়ে দিতে পারে। সব শুদ্ধু বান্ডিল করে হারাব। ডেলি প্যাসেনঞ্জারি তো? ৪ তারিখ রিটার্ন টিকিট কাটব।’
সব মিলিয়ে ভোটের ফল প্রকাশের আগে ভবানীপুরের এই ‘মাইক যুদ্ধ’ এখন পাড়ার আড্ডার মূল মশলা হয়ে দাঁড়িয়েছে।