এত বড় আন্দোলনেও খামেনি কীভাবে টিকে আছেন?

Spread the love

বছর বছর ব্যাপক বিক্ষোভ এবং বহিরাগত চাপ সত্ত্বেও বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল সরকারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সরকার। দেশজুড়ে সাম্প্রতিক জনবিস্ফোরণ এবং বিক্ষোভে ভয়াবহ সহিংসতার পরও নিরাপত্তা এলিটদের মধ্যে এখনো কোনো ধরনের ভাঙনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই অভিজাতদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হলে মুহূর্তেই সরকারের পতন ঘটতে পারে।

ইরানের শাসক গোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়িয়েই যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বারবার তিনি সামরিক আক্রমণের হুমকি দিচ্ছেন। দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই অবস্থান নিচ্ছেন। এর আগে গত বছর ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের পরমাণু প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। রয়টার্সকে দেওয়া এক মন্তব্যে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের হাতে “সব ধরনের বিকল্প” রাস্তা খোলা রয়েছে।


তবে রাজপথের বিক্ষোভ ও পশ্চিমা চাপ শাসনব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়ে কোনো বিচ্ছিন্নতা বা পালানোর ঘটনা ঘটাতে না পারলে সরকার দুর্বল হলেও ইরানের শাসন কাঠামো টিকে থাকবে বলেই মনে করেন রয়টার্সের কাছে মতামত প্রকাশ করেছেন দুই কূটনীতিক, মধ্যপ্রাচ্যের দুটি সরকারি সূত্র এবং দুই জন বিশ্লেষক।প্রায় আড়াই হাজার মানুষ এই বিক্ষোভে নিহত হয়েছে। ইরানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীরা দায়ী।


ইরানের বহুস্তর নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রেভ্যুলুশনারি গার্ডস এবং বাসিজ আধাসামরিক বাহিনী। এই দুই বাহিনীর সম্মিলিত সদস্য সংখ্যা প্রায় দশ লাখ। এই বিশাল কাঠামোর কারণে ভেতরকার কোনো ভাঙন না ঘটলে বাইরের চাপ দিয়ে ইরানকে নত করা খুবই কঠিন বলে মন্তব্য করেন ইরানি-আমেরিকান বিশ্লেষক এবং আঞ্চলিক সংঘাত ও মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসর।


তিনি বলেন, 

এ ধরনের পরিবর্তন সফল করতে হলে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে জনতাকে রাস্তায় থাকতে হয় এবং রাষ্ট্রের কাঠামোতে ভাঙন ঘটতে হয়। রাষ্ট্রের কিছু অংশ, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে বিদ্রোহ বা গণপক্ষত্যাগ করাতে হয়।


৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অতীতে বহু দফা বিক্ষোভের ঢেউ মোকাবিলা করেছেন। ২০০৯ সালের পর এটি পঞ্চম বড় বিদ্রোহ। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের পল সেলেমের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, সরকার এখনো যথেষ্ট স্থিতিশীল ও সমন্বিত; যদিও ভেতরে গভীর ও অমীমাংসিত সংকট চলছে।


সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান-বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার মনে করেন, এই বাস্তবতা বদলাতে হলে বিক্ষোভকারীদের এত শক্তি ও গতি তৈরি করতে হবে যাতে তারা প্রভাবশালী সরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত বিশাল জনগোষ্ঠী এবং ৯ কোটি মানুষের বিশাল ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত পরিসরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।


তবে বিশ্লেষকদের মতে, টিকে থাকা মানেই স্থিতিশীল থাকা নয়। ১৯৭৯ সালের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটির মুখোমুখি। বহু স্তরের নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলেছে এবং এই অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট পথ নেই। কৌশলগতভাবে ইরান এখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে রয়েছে। ধারণা করা হয় ইরানের পরমাণু কর্মসূচিও দুর্বল হয়ে গেছে। আর লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় মিত্রগোষ্ঠীর ভয়াবহ ক্ষতির কারণে তাদের আঞ্চলিক “প্রতিরোধ অক্ষ” ও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ভ্যালি নাসর বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখনই “পতনের মুহূর্তে” পৌঁছে গেছে বলে তিনি মনে করেন না। তবে দেশটি “এখন এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে যা সামনে অগ্রসর হওয়াকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে।”


এ দফায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল গত ২৮ ডিসেম্বর। দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দামের প্রতিবাদ থেকে শুরু, পরে সেগুলো সরাসরি ধর্মীয় শাসনবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এতে রাজনৈতিকভাবে যে সহিংস দমন চালানো হয়েছে তা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট বৈধতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ৫৭৩ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৫০৩ জন বিক্ষোভকারী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তাকর্মী। সংস্থাটির দাবি, ১০ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।


ইরান এ বিষয়ে কোনো সরকারি সংখ্যা প্রকাশ করেনি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে এই হিসাব যাচাই করতে পারেনি।


ইরানে শক্তিশালী বিকল্পগুলো বিবেচনা করছেন ট্রাম্প


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি আলাদা করে তুলেছে ট্রাম্পের স্পষ্ট সতর্কবার্তা। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। তার এই অবস্থানের কারণে ইরানের পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।


মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিক্ষোভকারীদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করার আহ্বান জানান ট্রাম্প। বলেন, “সহায়তা আসছে”। একই সঙ্গে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন। এর আগেও তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। মনে রাখা দরকার, চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।


একটি ইসরাইলি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত শনিবার এক ফোনালাপে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।


মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্কে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো পল সেলেম মনে করেন, ইরানের বিক্ষোভে নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ আদর্শিক নয় বরং কৌশলগত। তার লক্ষ্য হতে পারে ইরানি রাষ্ট্রকে এতটা দুর্বল করা, যাতে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার মতো ছাড় আদায় করা যায়।


রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের লক্ষ্য কী সে বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে হোয়াইট হাউসে পাঠানো অনুরোধের কোন জবাব মেলেনি। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, গত বছর ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন— তিনি যা বলেন, তা করেই দেখান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *