মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা আরও এক মারাত্মক ও বিপজ্জনক মোড় নিল। হরমুজ প্রণালীর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লারাক দ্বীপে (Larak Island) হামলার কড়া জবাব হিসেবে জর্ডনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। সেই সাথে তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এটি কেবল সূচনামাত্র; যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের বিপরীতে দেওয়া হবে অভাবনীয় ও চরম ধ্বংসাত্মক জবাব।
লারাক দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় হামলার পর থেকেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী আইআরজিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী জর্ডনে মার্কিন বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ও সামরিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রগুলোতে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই সামরিক সংঘাত, লারাক দ্বীপের ঘটনা এবং আইআরজিসি-র হুঁশিয়ারি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. লারাক দ্বীপের ঘটনা ও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত লারাক দ্বীপ ইরানের জন্য সামরিক ও জ্বালানি সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘাঁটি।
- লারাক দ্বীপে হামলা: তেহরানের দাবি অনুযায়ী, লারাক দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় শত্রুপক্ষের হঠাৎ হামলায় তাদের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই আক্রমণের পেছনে মার্কিন সমর্থিত বা প্রত্যক্ষ উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ তোলে ইরান।
- জর্ডনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা: লারাক দ্বীপে আক্রমণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান জর্ডনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একযোগে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও কামিকাজে ড্রোন হামলা চালায়।
- হামলার ক্ষয়ক্ষতি: আইআরজিসি-র দাবি, তাদের ছাঁটাই করা নির্ভুল মিসাইল হামলায় জর্ডনের মার্কিন ঘাঁটির প্রধান কমান্ড সেন্টার ও বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২. আইআরজিসি-র কড়া বিবৃতি ও ‘ধ্বংসাত্মক জবাবে’র হুঁশিয়ারি
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এক বিশেষ বুলেটিনে সরাসরি ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ারি জারি করেছে:
- বিভূতির মূল বার্তা: “লারাক দ্বীপের মতো পবিত্র জাতীয় ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা বড় ভুল করেছে। জর্ডনের ঘাঁটিতে আমাদের আক্রমণ হলো প্রাথমিক জবাব। আমাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু আমাদের মিসাইলের আওতায় আসবে।”
- সীমাহীন সংঘাতের ঝুঁকি: আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দেওয়া হবে “বিধ্বংসী ও অলৌকিক সামরিক জবাব”।
৩. বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাব
জর্ডনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের এই সরাসরি হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে:
- ১. জ্বালানি বাজারে আশঙ্কা: হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরীয় এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে।
- ২. মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: ওয়াশিংটন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জানিয়েছে যে তারা তাদের সেনাসদস্য ও ঘাঁটির সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মোতায়েনের প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে।
- ৩. জাতিসংঘের উদ্বেগ: জাতিসংঘের তরফ থেকে উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে, অন্যথায় এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
লারাক দ্বীপের ঘটনার পর জর্ডনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অজানাক্রান্ত সামরিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আইআরজিসি-র বিধ্বংসী জবাবের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাবনা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও বিশ্বশান্তির ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিল।