বিদেশের মাটিতে বসেই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। জার্মানিতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কংগ্রেস নেতার অভিযোগ, ‘আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর সর্বাত্মক দখল চলছে। গোটা ব্যবস্থাটার উপর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালানো হচ্ছে।’ আর তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিজেপি।
‘ভোট চুরি’র অভিযোগ
বার্লিনের হার্টি স্কুলে এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তোলেন কংগ্রেসের কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির পক্ষে কারচুপি করা হয়েছিল। এই অভিযোগ তিনি আগেও একাধিকবার তুলেছেন। রাহুল বলেন, ‘আমরা তেলাঙ্গানা, হিমাচল প্রদেশে নির্বাচন জিতেছি। কিন্তু ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলছি। হরিয়ানার নির্বাচনে আমরা যে জিতেছি, তার প্রমাণ আমরা সন্দেহাতীতভাবে তুলে ধরেছি। এমনকী মহারাষ্ট্রের নির্বাচনও ন্যায্য ছিল বলে আমরা মনে করি না।’ তিনি জানান, ভোটার তালিকায় ডুপ্লিকেট নাম-সহ একাধিক অনিয়মের প্রমাণ নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরা হলেও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। তাঁর কথায়, ‘আমরা মৌলিকভাবে বিশ্বাস করি, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় গুরুতর সমস্যা রয়েছে।’
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর আক্রমণ
হার্টি স্কুলে এক আলোচনা সভায় ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধী দাবি করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এসে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যত দলীয় স্বার্থে কব্জা করেছে। তাঁর অভিযোগ, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর মতো সংস্থাগুলিকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ শাসক দলের ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে এই সংস্থাগুলি কার্যত নিষ্ক্রিয়। রাহুলের ভাষায়, ‘আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর সর্বাত্মক দখল চলছে। গোটা ব্যবস্থাটার উপর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালানো হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, ইডি এবং সিবিআই-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ইডি ও সিবিআই-র কোনও মামলাই নেই। অথচ রাজনৈতিক অধিকাংশ মামলাই তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা বিজেপির বিরোধিতা করেন।’ লোকসভার বিরোধী দলনেতার অভিযোগ এখানেই থামেনি। তাঁর দাবি, কোনও ব্যবসায়ী যদি কংগ্রেসকে সমর্থন করেন, তাহলে তাঁকেও হুমকির মুখে পড়তে হয়। রাহুলের মতে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলি আর তাদের সাংবিধানিক ভূমিকা অনুযায়ী কাজ করছে না।

আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনীতি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেন রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ও আরএসএস আসলে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের অর্থনৈতিক নীতিরই সম্প্রসারণ করেছে, নতুন কোনও দিশা দেখাতে পারেনি। রাহুলের দাবি, মোদী সরকারের অর্থনৈতিক মডেল এখন কার্যত অচল গলিতে পৌঁছেছে এবং আর ফল দিতে সক্ষম নয়। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, বহু মানুষ প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সমর্থন করেন। তবে তাঁর মতে, দেশের এক বড় অংশ এই আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নয়। রাহুলের সতর্কবার্তা, এই দর্শন দেশকে গভীর সামাজিক বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর কথায়, ‘আমাদের বিশ্বাস, এই দর্শন ব্যর্থ হবে। এতে ভারতের ভিতরে প্রবল টানাপোড়েন তৈরি হবে, মানুষে-মানুষে সংঘর্ষ বাড়বে। এটাই ভারতে দুই ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষ।’
বিজেপির প্রতিক্রিয়া
জার্মানিতে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারী। মঙ্গলবার এক্স বার্তায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যে ব্যক্তি সত্যিই ভারতকে ভালোবাসে, সে কী কখনও দেশের ব্যর্থতা চাইতে পারে?’ তিনি অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী ও তাঁর ‘আদর্শিক পৃষ্ঠপোষক’ জর্জ সোরোস বিদেশে ঘুরে ‘ভারত বিরোধী শক্তি’কে একত্রিত করার চেষ্টা করছেন ও দেশের গণতন্ত্রে অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছেন। অন্যদিকে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি নেত্রী শোভা করন্দলাজে রাহুল গান্ধীকে ‘ভারত বিরোধী নেতা’ বলে কটাক্ষ করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বিদেশে গিয়ে দেশের বিরুদ্ধে কথা বলে রাহুল কী অর্জন করতে চান? তিনি এখনও একজন শিশুর মতো আচরণ করেন, একজন নেতার মতো নন।’