‘আমরা বর্তমানে যা দেখছি, তা কার্যত একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থা।’ ভোটমুখী রাজ্যে আইএএস-আইপিএসদের বদলি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব-সহ একাধিক জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার পদে রদবদল করেছে কমিশন। বিষয়টি নিয়ে সোমবারই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সেই চিঠির কোনও জবাব আসেনি। বদলি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সোচ্চার হলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও মুখ্যমন্ত্রী
বৃহস্পতিবার দীর্ঘ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গকে যে ভাবে আলাদা করে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, তা নজিরবিহীন শুধু নয়, উদ্বেগজনকও। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারির আগেই মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, এডিজি, আইজি, ডিআইজি, জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার-সহ ৫০-এরও বেশি শীর্ষ আধিকারিককে হঠাৎ স্বেচ্ছাচারী পন্থায় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।’ কমিশন ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান না নিয়ে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘যে সব প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ থাকার কথা, সেগুলোর উপরেও যে ভাবে সুপরিকল্পিত ভাবে রাজনীতির প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে, তা সংবিধানের উপর এক প্রত্যক্ষ আঘাত।’ পাশাপাশি, সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা কেন প্রকাশিত হল না, তা নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় বিজেপি
মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে স্পষ্ট ভাবে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। যার ফলে নাগরিকরা গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে, আইবি, এসটিএফ এবং সিআইডি-র মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর বরিষ্ঠ আধিকারিকদের বেছে বেছে পদ থেকে সরিয়ে রাজ্যের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে; যা বাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করে।’ এই সূত্র ধরেই বিজেপিকে নিশানা করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘বিজেপি এত মরিয়া কেন? কেন বাংলার মানুষ ও বাংলাকে এইভাবে লাগাতার নিশানা করা হচ্ছে? স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও কেন নাগরিকদের লাইনে দাঁড়িয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে?’

নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপের সমালোচনা
একাধিক আইপিএসকে বদলির সময়েই বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুরলীধর শর্মা ও শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজাকে ভিন রাজ্যের নির্বাচনে পুলিশ অবজার্ভার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমিশন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই সিদ্ধান্তে কিছুটা রদবদল করা হয়। এরপরেই কমিশনের ‘স্ববিরোধী’ পদক্ষেপের সমালোচনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘শিলিগুড়ি এবং বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারদের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করার সময়ে তাঁদের স্থলাভিষিক্ত কাউকে আগে থেকে নিয়োগ না করার ফলে এই দু’টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছিল। এই চরম প্রশাসনিক ত্রুটি প্রকাশ্যে আসার পরেই তড়িঘড়ি করে সংশোধনের পদক্ষেপ করা হয়। এটি কোনও সুশাসন বা প্রশাসনিক দক্ষতা নয়; বরং এটি বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং চরম অযোগ্যতারই প্রতিফলন।’
‘রাষ্ট্রপতি শাসনের এক অপ্রকাশিত রূপ’
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিকে মুখ্যমন্ত্রী ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ এবং ‘রাষ্ট্রপতি শাসনের এক ভিন্ন রূপ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা বর্তমানে যা প্রত্যক্ষ করছি, তা কার্যত একটি ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ এবং ‘রাষ্ট্রপতি শাসনের’ই এক অপ্রকাশিত রূপ। বাংলার মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে বিজেপি এখন জবরদস্তি কারচুপি করে, ভয় দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলির অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজ্য দখলের চেষ্টা করছে।’ এর সঙ্গেই রাজ্যের সব আধিকারিক এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি ‘পূর্ণ সংহতি’ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি অফিসার এবং তাঁদের পরিবারের পাশে আছি। সততার সঙ্গে কাজ করার জন্য তাঁদের টার্গেট করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলা কখনও ভয় দেখিয়ে দমানোর কাছে মাথা নত করেনি এবং করবে না।’ একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাংলার মানুষ এই বিভেদকামী রাজনীতির যোগ্য জবাব দেবে এবং লড়াই করে এই ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করবে।