স্টুডিওতে প্রথমবার পা রেখেছেন ১৬ বছরের এক কিশোরী। সামনে কিংবদন্তি পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালি। বসে আছেন সঙ্গীত পরিচালক ইসমাইল দরবার। কথা ছিল গানটি একবার ঝালিয়ে নেওয়া হবে অর্থাৎ ‘প্র্যাকটিস’ করা হবে। কিন্তু সেই প্র্যাকটিস সেশনই যে ভারতের জাতীয় পুরস্কার জয়ী এক গানে পরিণত হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি শ্রেয়া ঘোষাল।
বনশালির সেই জহুরির চোখ:
সঞ্জয় লীলা বনশালি যখন ‘দেবদাস’-এর জন্য নতুন কণ্ঠ খুঁজছিলেন, তখন তাঁর মা ‘সা রে গা মা পা’ রিয়েলিটি শো-তে শ্রেয়াকে গান গাইতে দেখেন। বনশালি শ্রেয়াকে ডেকে পাঠান। স্টুডিওতে শ্রেয়াকে গানটি শোনানো হয় এবং বলা হয় একবার গেয়ে দেখতে।
প্র্যাকটিস সেশনই ফাইনাল টেক:
শ্রেয়া ভেবেছিলেন এটি কেবল রিহার্সাল হচ্ছে, তাই তিনি কোনও চাপ না নিয়েই মন খুলে গেয়েছিলেন। সেই রেকর্ডিং চলাকালীন শ্রেয়ার গলায় এমন এক অদ্ভুত সারল্য এবং সুরের খেল ছিল যে, স্টুডিওর কাঁচের ওপাশে বসে থাকা বনশালি মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি সেই প্রথম ‘টেক’টিই ফাইনাল হিসেবে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই বিখ্যাত ‘ইশশ…’:
‘বয়েরি পিয়া’ গানে শ্রেয়া যখন ওই মিষ্টি করে ‘ইশশ…’ শব্দটি বলেছিলেন, সেটিও ছিল একদম তাৎক্ষণিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। শ্রেয়া পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি জানতেনই না যে ওই কাঁচা খসড়াটিই সিনেমায় ব্যবহার করা হবে। যখন তিনি শুনলেন যে তাঁর প্রথম রিহার্সালই চূড়ান্ত করা হয়েছে, তখন তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
জাতীয় পুরস্কারের হাতছানি:
এই একটি গান শ্রেয়ার জীবন বদলে দিয়েছিল। তাঁর সেই ‘প্র্যাকটিস সেশন’-এর গানটিই তাঁকে শ্রেষ্ঠ প্লে-ব্যাক সিঙ্গারের জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়। আজ ২০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেও সেই গানের মাধুর্য একটুও কমেনি।
ছবির শেষ গানটি একটি রিহার্সাল টেক হয়ে ওঠে উদিত নারায়ণের সাথে শ্রেয়া গেয়েছেন এই গানের জাদু এমন ছিল যে বনশালী অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সেই অনুশীলন সেশনে শ্রেয়ার গ্রহণ এতটাই উজ্জ্বল এবং নিখুঁত ছিল যে পরিচালক এটিকে ছবির চূড়ান্ত সংস্করণ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একটি 16 বছর বয়সী মেয়ে তার কণ্ঠস্বর দিয়ে স্টুডিওর সবাইকে পাগল করে তুলেছিল। সেই সময়, কেউই ভাবেনি যে একটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ রিহার্সাল টেক শ্রেয়া ঘোষাল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার এনে দেবে।
‘দেবদাস’ ছবির এই গানের সাফল্যের পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে পারেননি শ্রেয়া ঘোষাল। এই গানটি তার ক্যারিয়ারকে এতটাই উত্সাহ দিয়েছিল যে তিনি বলিউডের সর্বাধিক জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পীদের একজন হয়ে ওঠেন। এরপর কেটেছে ২৪ বছর। শ্রেয়ার জনপ্রিয়তা দিনদিন বৃদ্ধি পেয়েছে।

শ্রেয়ার কেরিয়ার
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম। মাত্র ৪ বছর বয়স থেকেই মায়ের কাছে গানের তালিম শুরু করেন শ্রেয়া। পরবর্তীতে রাজস্থানের রাওয়াতভাটায় বড় হয়ে ওঠা এবং প্রথাগত হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা গ্রহণ। ২০০০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে জি টিভির রিয়ালিটি শো ‘সা রে গা মা পা’-তে অংশ নেন এবং বিজয়ী হন। সেখানেই পরিচালক সঞ্জয়লীলা বনশালির নজরে আসেন তিনি। বনশালি তাঁর ড্রিম প্রজেক্ট ‘দেবদাস’-এ ঐশ্বর্য রাইয়ের (পারো) কণ্ঠ হিসেবে শ্রেয়াকে সুযোগ দেন। ‘ডোলারে ডোলা’ বা ‘বৈরি পিয়া’-র মতো গানে তাঁর কাজ রাতারাতি তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়। প্রথম ছবিতেই জেতেন ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় আড়াই দশক ধরে শ্রেয়ার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ আসমুদ্র হিমাচল। লতা পরবর্তী জমানায় গোটা দেশের সবচেয়ে পছন্দের গায়িকার তালিকায় একদম উপরের দিকে রয়েছেন এই বাঙালি কন্যে।