ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আরও এক বড় সাফল্য অর্জন করল পশ্চিমবঙ্গ। ভারত সরকারের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (GI) রেজিস্ট্রির তালিকায় একসঙ্গে রাজ্যের ১২টি ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও শিল্পের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর ফলে এই পণ্যগুলির মৌলিক পরিচয় আইনগত সুরক্ষা পেল। একইসঙ্গে দেশ-বিদেশের বাজারে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং হস্তশিল্পের পরিচিতি আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
নতুন জিআই স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যের তালিকায় রয়েছে বীরভূমের শান্তিনিকেতনের বাটিক ও শান্তিনিকেতনের একতারা। এছাড়াও বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ, হটোগ্রামের শাঁখা শিল্প, বিক্রমপুরের বেঙ্গল সিঙ্গিং বোল, হুগলির বলাগড়ের নৌকা ও জনাইয়ের মনোহরা, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কলকাত্তি গয়না, পুরুলিয়ার লাক্ষা, মুর্শিদাবাদের সিল্ক, মালদহের আশাপুরের বেগুন এবং পূর্ব বর্ধমানের কাঠের পুতুল।
এছাড়াও আরও তিনটি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আবেদন এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে। এগুলি হল মালদহের নবাবগঞ্জের বেগুন, পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাইয়ের বাবরশা মিষ্টি এবং শান্তিনিকেতনের আলপনা। খুব শীঘ্রই এই পণ্যগুলিও জিআই স্বীকৃতি পাবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। এই গোটা জিআই আবেদন প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস চেয়ার অধ্যাপক পিনাকী ঘোষ। তাঁর নেতৃত্বে গবেষক দল পশ্চিমবঙ্গের মোট ১৫টি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জন্য আবেদন করেছিল। তার মধ্যে ইতিমধ্যেই ১২টি সফলভাবে জিআই স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যা রাজ্যের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
এই গবেষণা প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বীরভূমের গবেষক ও অধ্যাপক শুভদীপ মণ্ডল। তথ্য সংগ্রহ, ঐতিহাসিক নথি প্রস্তুত, সাংস্কৃতিক প্রমাণ উপস্থাপন এবং আবেদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, জিআই ট্যাগ শুধুমাত্র একটি সরকারি স্বীকৃতি নয়, এটি স্থানীয় শিল্পী, কারিগর এবং উৎপাদকদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ এবং নকল পণ্যের বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের বাটিক ও একতারার স্বীকৃতিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন শুভদীপ। তাঁর কথায়, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই শান্তিনিকেতনের বাটিক ও একতারা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। এই জিআই স্বীকৃতি সেই ঐতিহ্যকে আরও মর্যাদা দিল। বীরভূমের মানুষ হিসেবে এই ঐতিহাসিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই স্বীকৃতির ফলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। একইসঙ্গে স্থানীয় শিল্পী, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধি এবং বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।