ভারত বলেছে ওসমান হাদি হত্যার সঙ্গে যুক্ত কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি মেঘালয়ে। এরই সঙ্গে ভারতের বিএসএফ স্পষ্ট করে দিয়েছে, হাদির হত্যাকারীরা ভারতে অনুপ্রবেশও করেনি। যদিও এর আগে ঢাকা পুলিশ জোর গলায় দাবি করেছিল, পুত্তি এবং স্বামী নামে দুই ব্যক্তিকে নাকি হাদি হত্যাকাণ্ডে ধরা হয়েছে মেঘালয়ে। তবে ঢাকা পুলিশের সেই মিথ্যা ফাঁস হয়ে গিয়েছে। এই আবহে নয়া সাফাই দিল ডিএমপি। এই আবহে ঢাকা পুলিশের তরফ থেকে দাবি করা হল, হাদির হত্যাকারী ফয়সল করিমকে ‘বাংলাদেশ ত্যাগ’ করতে যারা সাহায্য করেছে, তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে তারা। তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই পুলিশ বলেছিল যে ফয়সলরা ভারতে পালিয়ে গিয়েছে। তারপর নাকি সীমান্তে ‘সূত্র’ মারফত তারা জানতে পারে যে, ফয়সলদের আশ্রয় দেওয়া দুই ভারতীয় নাকি গ্রেফতার হয়েছে মেঘালয়ে। এরই সঙ্গে বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি, সংশ্লিষ্ট সব অপরাধীকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভারত সরকার পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
উল্লেখ্য, এর আগে ঢাকা পুলিশ জানিয়েছিল, হাদির হত্যাকারীরা যে ভারত পালিয়ে গিয়েছে, তেমন কোনও তথ্য তাদের কাছে নেই। হাদি প্রেমীদের আন্দোলনের চাপে অবশ্য ঢাকা পুলিশ এই বক্তব্য থেকে সরে এসেছে সম্প্রতি। এই আবহে বাংলাদেশের দাবি খারিজ করে দিল বিএসএফ এবং মেঘালয় পুলিশ। ভারতীয় বাহিনীর তরফে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, সম্পূর্ণ মিথ্যে এবং ভিত্তিহীন দাবি করা হচ্ছে।
এর আগে ২৭ ডিসেম্বর হাদি প্রেমীদের বিক্ষোভ স্থলে এসে বড়া দাবি করেছিলেন ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি দাবি করেন, ‘হাদির খুনিদের নাকি ভারত থেকে ফেরানো হবে।’ রিজওয়ানা বলেন, ‘আমরা এমন একটি চার্জশিট দিতে চাই, যাতে কোথাও কোনও ফাঁকফোকর না থাকে। তদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা ও প্রমাণ যাচাই শেষ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মধ্যেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। হত্যাকাণ্ডের কিছু আসামি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তবে তাদের বিচার এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ থাকবে না। এই বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে কথা বলা হয়েছে। ভারত আশ্বাস দিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধে আসামিদের খুঁজে পাওয়া গেলে তাদের ফেরত পাঠাতে সহযোগিতা করবে। পালিয়ে গেলেই দায়মুক্তি নয়।

প্রয়োজনে অনুপস্থিতিতেও বিচার প্রক্রিয়া এগোবে। একইসঙ্গে আমরা চেষ্টা করছি, যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে ধারণা, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের সামনে দাঁড় করানো হবে।’প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ থেকে হাসিনার বিদায়ের পর একাধিক জনসভায় এই ওসমান হাদি বিভিন্ন জনসভায় স্লোগান তুলেছিলেন – ‘দিল্লি না ঢাকা…’। বাংলাদেশের সেই ছাত্র নেতা গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই ভারতের বিকৃত একটি মানচিত্র পোস্ট করেছিলেন ফেসবুকে। একটি আলোচনা সভার সেই পোস্টে ভারতের থেকে পঞ্জাব, লাদাখ এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন দেখানো হয়েছিল। সেগুলিকে পাকিস্তানের এলাকা হিসেবে দেখানো হয় মানচিত্রে। এদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহারের অধিকাংশ এলাকা, গোটা ঝাড়খণ্ড, উত্তরপূর্ব ভারত এবং মায়ানমারের আরাকান প্রদেশের উপকূলীয় এলাকাটিকে ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’-এর অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এদিকে অভিযোগ করা হয়, হাদির হত্যাকারী ফয়সল করম নাকি ভারতে পালিয়ে যায়। এমনকী হাদির বোন তো এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভারতের ‘র’-এর হাত আছে বলেও ভিত্তিহীন অভিযোগ করছিলেন।
উল্লেখ্য, ওসমান হাদিকে গুলি করা হয় গত ১২ ডিসেম্বর। ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির মৃত্যু হয় সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে। এই ঘটনা সামনে আসার পরপরই বাংলাদেশ জুড়ে তাণ্ডব শুরু হয়। ইনকিলাব মঞ্চের সমর্থক এবং হাসিনা বিরোধীরা ঢাকা, রাজশাহী সহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ঢাকার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের ধ্বংসস্তূপে ফের হামলা হয়। ধরানো হয় আগুন। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের অফিসে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে উন্মত্ত জনতা। এদিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ এবং ‘ডেইলি স্টার’-এর অফিসেও তাণ্ডব চালানো হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরই সঙ্গে ভারত বিরোধী স্লোগানও শোনা যায় – ‘দিল্লি না ঢাকা’, ‘ভারতের আগ্রাসন, ভেঙে দাও-গুঁড়িয়ে দাও’। হামলা হয় চট্টগ্রামে ভারতীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট হাইকমিশনে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনেও হামলার চেষ্টা চালানো হয়। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় বর্মাকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়। সেই বিক্ষোভের রেশই এখনও চলছে বাংলাদেশে। সেখান থেকেই ক্রমাগত ভারত বিরোধী স্লোগানও উঠছে।