মণিপুরে রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছিল রাস্তা। শুধু তাই নয়, এই ‘রিং রোড’-এর নাম আবার রাখা হয় জঙ্গি নেতার নামে! পড়শি দেশ থেকে যখন ক্রমাগত সেভেন সিস্টার্স ভাগের হুমকি আসছে, তার মাঝে মণিপুরের এই ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যে রাস্তা নিয়ে এত চর্চা, সেটি মোট ছয়টি জেলার মধ্য দিয়ে গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই রাস্তার কিছু অংশ স্থানীয়ভাবে জার্মান রোড বা টাইগার রোড নামে পরিচিত। স্থানীয় কুকি জঙ্গিদের উপাধিতেই এই নামকরণ বলে জানা গিয়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিন ট্রাব্যুনাল এই রাস্তাটি নিষিদ্ধ করেছে।
জানা গিয়েছে, গত ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) মণিপুর সরকারকে রিং রোডের সব কাজ বন্ধ করতে বলে। আর এর পরই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। উল্লেখ্য, রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলে এশিয়ান ব্যাঙ্কের সহায়তায় নির্মিত রিং রোড থেকে আলাদা বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই রিং রোডটি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মণিপুরের মেইতেই সম্প্রদায়ের সুশীল সমাজ সংগঠন কোকোমির পিটিশনের দায়ের করেছিল কলকাতার এনজিটি অফিসে। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই রিং রোডের কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় এনজিটির তরফ থেকে। পিটিশনে বলা হয়েছে, পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন ছাড়াই বনাঞ্চলে এই রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে।
কারা রাস্তা নির্মাণ করছিল? এনজিটি জানিয়েছে, চুড়াচাঁদপুর, কাংপোকপি, ননি ও উখরুল জেলার বনাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া রাস্তাটি তৈরি করছিল কুকি সম্প্রদায়। এবং সেই রাস্তায় লাগানো বোর্ডে জঙ্গিদের নামে নামকরণ করা হয়েছে রাস্তাটির। এই রাস্তাটি আবার উদ্বোধন করেছিলেন সাইকুলের বিধায়ক। এই রাস্তাটি গোপনে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এই রাস্তা দিয়েই নাকি অবৈধ মাদক চোরাচালান, ছোট অস্ত্র ও গোলাবারুদের অবৈধ চলাচল এবং অবৈধ অভিবাসীদের চলাচল হয়। প্রসঙ্গত, বিগত কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশি কট্টরপন্থী নেতারা বলে আসছে, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তারা সাহায্য করবে। এরই মাঝে আবার খলিস্তানি জঙ্গি নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন উত্তরপূর্ব ভারতে ‘ট্রাম্পল্যান্ড’ নামে পৃথক খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুলে বিকৃত ম্যাপ পোস্ট করেছিলেন। এরই মাঝে মণিপুরে জঙ্গিদের নামের এই রাস্তার খবর হতবাক করে দেওয়ার মতো।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই মণিপুরে কুকি এবং মৈতৈ জনজাতির মধ্যে সংঘাত বজায় রয়েছে। গত ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে জাতিগত হিংসার সাক্ষী মণিপুর। মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি অবস্থা। এখনও পর্যন্ত কয়েক হাজার জনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। চূড়াচাঁদপুর, মোরে, কাকচিং এবং কাংপোকপি জেলা থেকে অধিকাংশ মানুষকে সরানো হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, ইম্ফল উপত্যকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হল মৈতৈ জনজাতি। তবে তারা দাবি তুলেছিল যে তাদের তফসিলি উপজাতির তকমা দিতে হবে। তাদের এই দাবির বিরোধ জানিয়েছিল স্থানীয় কুকি-জো আদিবাসীরা। এদিকে হাই মণিপুর হাই কোর্টে এই নিয়ে মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় হাই কোর্ট নির্দেশ দেয়, মৈতৈদের নাম তফশিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখুক রাজ্য। এই নির্দেশিকার পরই জো-কুকি সম্প্রদায়ের মানুষরা প্রতিবাদে নামেন। এই আবহে ২০২৩ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে মণিপুরের অল ট্রাইবাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন একটি মিছিলের আয়োজন করেছিল। সেই মিছিল ঘিরেই হিংসা ছড়িয়ে পড়ে চূড়াচাঁদপুর জেলায়। পরে অবশ্য হাই কোর্ট সংরক্ষণ নিয়ে নিজেদের সেই পর্যবেক্ষণ ফিরিয়ে নেয়।