মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের মেঘ এবং ইজরায়েল-আমেরিকার সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ বর্তমানে বক্সিং রিংয়ে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ইরান এই কৌশলগত জলপথের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই চরম অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের জন্য স্বস্তির বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানি প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ‘আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা নিরাপদ হাতে আছে, চিন্তার কোনও কারণ নেই (ডোন্ট অরি)।’ ভারতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসের তরফে সেই আশ্বাসবাণী দেওয়া হয়েছে।
সংকটের মূলে হরমুজ প্রণালী
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট উত্তোলিত খনিজ তেল এবং এলপিজির অনেকটা পরিবাহিত হয়। ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ অভিযানের পাল্টা হিসেবে ইরান এই প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় তেল এবং গ্যাস নিয়ে মারাত্মক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেক দেশই তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
ভারতের জন্য বিশেষ ছাড় ও কূটনৈতিক জয়
ইরানে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে যে তারা কেবল তাদের ‘শত্রু দেশ’ এবং তাদের মিত্রদের জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু ভারতের চিন্তার কোনও কারণ নেই। ‘আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা সুরক্ষিত হাতে আছে। চিন্তা করবেন না।’
সম্প্রতি ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। এই আলোচনার পরেই ইরানের পক্ষ থেকে ভারতীয় জাহাজগুলোর জন্য ‘সেফ প্যাসেজ’ বা নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সূত্রের খবর, ‘শিবালিক’ এবং ‘নন্দা দেবী’র মতো একাধিক ভারতীয় এলপিজি ট্যাঙ্কার অত্যন্ত নিরাপদে এই বিপদসংকুল এলাকা পার হয়ে মুম্বই বন্দরে পৌঁছেছে।

ইরানের বার্তা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, ‘আমরা কোনও সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের পথ রোধ করতে চাই না। কিন্তু আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। ভারতের মতো বন্ধু রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের অগ্রাধিকার।’
বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ যখন চরম পর্যায়ে, তখন ভারতের প্রতি এই সৌজন্য প্রদর্শন নয়াদিল্লির সফল ‘ব্যালেন্সিং ডিপ্লোম্যাসি’ বা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ফল। ভারত একদিকে যেমন আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত মিত্রতা বজায় রেখে চলেছে।