তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের পর কেটে গিয়েছে গোটা একটা রাত। কিন্তু এখনও শেষ হয়নি উদ্ধার অভিযান। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে লোহার বিশাল বিম, ভাঙা কংক্রিটের চাঙড় এবং ধ্বংসস্তূপ। বুধবার রাতভর উদ্ধারকাজ চলার পর বৃহস্পতিবার সকালেও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধার অভিযান। প্রশাসন সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার সকালে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। আরও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে জোরকদমে চলছে অনুসন্ধান। এই আবহে সেনার তরফ থেকে অত্যাধুনিক রাডার (গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার) দিয়ে প্রাণের স্পন্দন খুঁজছে সেনা। নামানো হয়েছে প্রশিক্ষিত স্নিফার ডগ।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কারণে বুধবার দুপুর থেকেই উদ্ধারকাজে নামানো হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীকে। বৃহস্পতিবার সকালেও সেনার বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সেনার আধুনিক সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত কর্মীদের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের খোঁজ চালানো হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ রাডার প্রযুক্তি, যা কংক্রিট ও লোহার স্তূপের নিচে জীবনের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম। পাশাপাশি স্নিফার ডগ বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুরও মোতায়েন করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরাও যৌথভাবে কাজ করছেন। উদ্ধারকারী দল ধাপে ধাপে ভারী কংক্রিট ও লোহার কাঠামো সরিয়ে দেখছে কোনও ব্যক্তি এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন কি না। কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিতে চাইছে না প্রশাসন। তাই সম্পূর্ণ এলাকা খতিয়ে দেখার পরেই উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। এই দলে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক অভিজ্ঞ আধিকারিক। তদন্তকারী দলের নেতৃত্বে রয়েছেন এসিপি জয়সূর্য মুখোপাধ্যায়। এছাড়া রয়েছেন গোয়েন্দা দপ্তরের হোমিসাইড বিভাগের অফিসার-ইন-চার্জ দেবাশিস দত্ত, ইন্সপেক্টর হিরক দলপতি, গুণ্ডাদমন শাখার ইন্সপেক্টর সরফরাজ আহমেদ এবং তারাতলা থানার সাব-ইন্সপেক্টর মানস ভট্টাচার্য ও কুশল মণ্ডল।

ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন নির্মাণকাজের সুপারভাইজার গুলজার হোসেন, লোহার কাঠামো প্রস্তুতকারক কমল সামন্ত, জমির লিজগ্রহীতা শম্ভুনাথ বেহেরা, শ্রমিক সরবরাহকারী ও ঠিকাদার দিবারক ভাণ্ডারি এবং নির্মাণ পরিকল্পনার অনুমোদন সংক্রান্ত মধ্যস্থতাকারী আবদুল হামিদ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নির্মাণকাজে আরও কারও গাফিলতি বা ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এলে আরও গ্রেপ্তারির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তারাতলা বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় এই বিষয়ে বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। উদ্ধারকাজের অগ্রগতি, তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। ধ্বংসস্তূপের মাঝে এখনও চলছে জীবন খোঁজার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে সেনাবাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ধার অভিযানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন উদ্ধারকর্মী ও প্রশাসনিক কর্তারা।