দুঃস্বপ্নের লিফট। মর্মান্তিক ঘটনায় ফের একবার শিরোনামে উঠে এসেছে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। নাগেরবাজারের বাসিন্দা ৪০ বছরের অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত পাঁচজনকে শুক্রবারই গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবার তাঁদের আদালতে পেশ করা হয়। জামিনের আর্জি জানিয়ে তাঁদের দাবি, আসল অভিযুক্তদের আড়ালে রেখে নিরীহ মানুষদের সামনে আনা হচ্ছে। তবে সরকারি আইনজীবীরা দাবি করেন, কড়া শাস্তি দেওয়া হোক অভিযুক্তদের।
শনিবার লিফটে আটকে যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করে শিয়ালদহ আদালত পেশ করা হয়। সরকারি আইনজীবী অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় আদালতে বলেন, ‘এরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফূর্তি করেছে। গান শুনেছে, মানুষ মেরেছে। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রকে এরা মানুষ মারার যন্ত্র করে দিয়েছে। লিফট বন্ধ রাখার দায়িত্ব ছিল, সেই কাজ করেনি।’ তদন্তের প্রয়োজনে এদের প্রত্যেককে ১৪ দিনের জন্য হেফাজতে চেয়ে আবেদন জানানো হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতরা হলেন লিফটম্যান মিলনকুমার দাস (৪৯), বিশ্বনাথ দাস (৪৮), মানসকুমার গুহ (৫৫), নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান (৩১) ও শুভদীপ দাস (২৫)। সব পক্ষের আইনজীবীদের সওয়াল জবাব শোনার পর বিচারক আগামী ২৭ মার্চ পর্যন্ত ধৃতদের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়।
এদিকে, অভিযুক্তদের আইনজীবীরা যে কোনও শর্তে জামিনের আবেদন করেন। তাঁদের দাবি, যে পাঁচজনকে গ্রেফতার হয়েছে তাঁদের মধ্যে দু’জন নিরাপত্তারক্ষী আছেন, লিফটের জন্য নির্দিষ্ট লিফটম্যান আছেন। সিকিউরিটি গার্ড লিফটের সমস্যা বিষয়ে কীভাবে বুঝবেন, প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। এরপরেই আদালতে মৃতের পরিবারের তরফে আইনজীবীরা জামিনের বিরোধিতা করেন। কর্মীদের গাফিলতির অভিযোগ তুলে ধরেন তাঁরা। পাশাপশি মৃতের পরিবারের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, এই পাঁচজন ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন ছিল, যারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি। তাঁদের প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় আনা হোক বলে দাবি জানিয়েছে মৃতের পরিবার। অন্যদিকে, অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে গতি আনতে আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে পৌঁছয় রাজ্য ফরেন্সিক দল। দলের সদস্য ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় ও চিত্রাক্ষ সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। একইসঙ্গে লালবাজারের হোমিসাইড শাখার দুই আধিকারিকও সেখানে পৌঁছে তদন্তে যোগ দেন। একদিকে ফরেন্সিকের তিন সদস্য, অন্যদিকে হোমিসাইড শাখার তিন আধিকারিক-দুই সংস্থার যৌথ তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে ঘটনার প্রতিটি দিক। বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, লিফটের কার্যপ্রণালী এবং উদ্ধার প্রক্রিয়ার সময়কাল নিয়ে।

শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ডিউটি রোস্টার খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই সময়কালে দায়িত্বে থাকা জুনিয়র ডাক্তার, নার্স, গ্রুপ ডি কর্মী এবং চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তারক্ষীদের একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কার দায়িত্বে কী ছিল, কে কোথায় উপস্থিত ছিলেন সব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। কোন সময় লিফটের গতিবিধি কী ছিল, কোথায় কী ধরনের অসংগতি দেখা গিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, লিফটটি লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সল্টলেক-ভিত্তিক একটি কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছিল। ওই সংস্থা একই বিল্ডিং আরও দুটি লিফটও পরিচালনা করে। অন্যদিকে, হাসপাতালের বাকি ২৯টি লিফট বিভিন্ন কোম্পানি দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।