ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনেও রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় লাখো শোকাহত মানুষের ঢল নেমেছে। তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহ সত্ত্বেওিআজ রোববার (৫ জুলাই) ভোর থেকেই নারী, পুরুষ, শিশু ও প্রবীণরা দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে খামেনির মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গরমে শোকাহত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে মোসাল্লা প্রাঙ্গজুড়ে জল ছিটানোর মিস্টার স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি হাজারো স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত মানুষের মধ্যে ঠান্ডা জল, শরবত ও অন্যান্য পানীয় বিতরণ করছেন। চিকিৎসা সহায়তার জন্য মোবাইল মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানকে ঘিরে তেহরানজুড়ে আজও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের আগে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেকেই খামেনির প্রতিকৃতি, ইরানের জাতীয় পতাকা এবং ধর্মীয় পতাকা বহন করছেন। বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত জনতা স্লোগান দিচ্ছেন এবং দেশটির নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে দেখা যায়, মরদেহবাহী কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ দোয়া ও কোরআন তেলাওয়াত করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আগ্রাসনের প্রথম দিন নিহত হন ৮৬ বছর বয়সি খামেনি। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। ওই সময় তিনি তেহরানে তার আবাসিক ভবনে ছিলেন।
গত মার্চে খামেনির দাফন হওয়ার কথা ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে তীব্র সংঘাতের কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধবিরতির অবসরে চার মাস পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সাত দিন ধরে চলবে যা গত শুক্রবার (৩ জুলাই) শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতেই খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের কফিন রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্রান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে আনা হয়। শনিবার (৪ জুলাই) ভোর থেকে গ্র্যান্ড মোসাল্লার সামনে ঢল নামে মানুষের। খামেনির প্রতি শোক ও শেষশ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হন ইরানিরা। দিনভর শ্রদ্ধা জানান প্রিয় নেতার প্রতি।

এদিন গ্রান্ড মোসাল্লায় শায়িত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ শীর্ষ নেতারা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং ইরানের মিত্রদের পরিবারও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। তবে এবার ইউরোপীয় দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানায়নি তেহরান।
এদিকে খামেনির স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ না নিতে অন্তত ১৩টি দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করেছিল বলে খবর প্রকাশ করেছে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন চাপের মুখে পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা, উপসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব এশিয়ার অন্তত ১৩টি দেশ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
মূলত তেহরানে সাধারণ মানুষের জন্য দুই দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় সর্বস্তরের মানুষ খামেনি ও তার পরিবারের প্রয়াত কয়েকজন সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। ইরান কর্তৃপক্ষ বলছে, সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের শাসনক্ষমতায় থাকা খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে শুধু তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার (৬ জুলাই) খামেনির শোকযাত্রা ইরানের দক্ষিণে কোম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। এরপর ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ গন্তব্য হবে মাশহাদ। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের মাজার এবং খামেনির জন্মস্থান হওয়ায় সেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে ইরান।
ইরান কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৯৮৯ সালে খামেনির পূর্বসুরি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় জনসমাগম হতে চলেছে। খোমেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কোটি কোটি মানুষ অংশ নিলেও নিরাপত্তার কারণে বাবার শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না ছেলে মোজতবা খামেনি। সম্প্রতি তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরাইল।